Showing posts with label আফ্রিকা. Show all posts
Showing posts with label আফ্রিকা. Show all posts

Thursday, November 3, 2011

কেবলই দুর্ভোগ কান্না-রক্ত (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৮)

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের খনিজ সম্পদের প্রসঙ্গ উঠলেই দেশটির হীরা, সোনা আর কোলটানের কথা ওঠে। দেশটির ইন্ধন সম্পদও কম নয়। এ সম্পদ এখন ক্রমান্বয়ে আগ্রহীদের চোখে পড়ছে। দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস ও কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুদ। এছাড়া পানি বিদ্যুৎ তৈরির সম্ভাবনাও বিপুল। প্রায় এক লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে দেশটিতে। এ পরিমাণ হচ্ছে বিশ্বে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের প্রায় ১৩ শতাংশ। এসবই দেশটির প্রতি আকৃষ্ট করছে মুনাফা সন্ধানকারীদের।

আফ্রিকার দক্ষিণ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অশোধিত তেলের মজুদ এঙ্গোলার পরেই; অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানীয়। দেশটির অশোধিত তেলের মজুদ ২০০৯ সালের হিসাব অনুসারে ছিল ১৮ কোটি ব্যারেল। তেল ও গ্যাস বিষয়ে দেশটি প্রথমবারের মতো সম্মেলন আয়োজন করে ২০০৮ সালের মধ্য আগস্টে। এ খবর জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার।

দেশটিতে তেল খোঁজার কাজ শুরু হয় গত শতকের ষাটের দশকে। সেখানে উপকূলের কাছে সাগরে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। ভূ-ভাগে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। এ তোলার কাজ ১৯৮৬ সালে চলছিল আটটি তেল ক্ষেত্র থেকে। এরপর থেকে তেল আহরণের কাজ বেড়ে চলে। এ ঘটনা ধারার সঙ্গে দেশটিতে হানাহানি-সংঘাত-যুদ্ধের এবং এসব হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির জ্বালানি জরিপ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় : কঙ্গোতে তেলের প্রমাণিত মজুদ বিপুল। গ্যাসও তেমন আছে। তেলের ওপর ভিত্তি করেই দেশটির সবল অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। স্থলভাগে তেল-গ্যাস যা আছে, তাতে হাতের ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে। উপকূলের কাছে তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল তুলছে ফ্রান্সের পেরেনকো, জাপানের টেইকোকু, যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন টেক্সাকো। স্থলভাগে, উপকূল অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গা তেল তুলছে পেরেনকো এবং কঙ্গোর তেল কোম্পানির কোহাইড্রো। আরো ছয়টি ব্লক নির্দিষ্ট করে সেগুলোতে সন্ধান কাজ চালানোর জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এনারগাল্ফ, যুক্তরাজ্যের সোকো এবং শিওরাস্ট্রিম নামের কোম্পানিকে। মধ্য সমতল অঞ্চলে উগান্ডা সীমান্তের লাগোয়া লেক কিভুতেও তেল রয়েছে। কিন্তু হ্রদের লাগোয়া এলাকায় উগান্ডা এরই মধ্যে ভালো মানের তেল তুলছে। ফলে এখানে বেড়েছে উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতা। কঙ্গোতে তেলসংশ্লিষ্ট নানাপর্যায়ের কাজে জড়িত রয়েছে শেল, ফিনা, টোটাল, এনজেন, কোবিল, কঙ্গো অয়েল ও কোহাইড্রো।

এ দেশটিতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি নথিতে বলা হয় : নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ২৬ ট্রিলিয়ন বা ২৬ লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলো সবল করা ইত্যাদি উদ্যোগ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করছে। এজন্য দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুবিধা। এ সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ছাড়, মুনাফার ওপর করসহ বিভিন্ন কর রেয়াত, বিদেশী বিনিয়োগ ও সম্পদ নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ দলিলেই বলা হয় : কঙ্গোতে রয়েছে নগর অঞ্চলে অবস্থানরত বিপুল শ্রম। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ বিদ্যালয় উত্তীর্ণ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। তবে দক্ষ শ্রমের ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুঁজি আনা-নেওয়া প্রসঙ্গে এ নথিতে বলা হয় : কঙ্গো থেকে পুঁজি রফতানিতে এবং অন্যত্র সরাসরি বিনিয়োগের ব্যাপারে কোনো নীতি নেই। অর্থাৎ  পুঁজির চলাচল অবাধ অনিয়ন্ত্রিত। এরই মধ্যে কঙ্গোতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখা দিয়েছে শেভরন অয়েল (কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি কঙ্গো গাল্ফ অয়েলকে সঙ্গে নিয়ে), সিটি ব্যাংক, টেলেসেল, মবিল। এসব তেল, ব্যাংক আর টেলিফোন কোম্পানির সঙ্গে একইসারিতে রয়েছে বিয়ার তৈরির কোম্পানি ব্র্যালিমা ও ইউনিব্রা, সিগারেট তৈরির কোম্পানি টোবাকঙ্গো/রথম্যান ও বিএটিকঙ্গো, পাইকারি ব্যবসায়ী হাসন গ্রুপ, পাম তেল শোধনের কোম্পানি পিএলসি।

একটি দেশের সম্পদ প্রকৃত অর্থে লুট করার জন্য আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে। সম্পদ আছে, সে সম্পদ নির্বিঘ্নে লুট করার জন্য রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এ সংক্রান্ত সব কাজ সুরক্ষার জন্য আছে আইনের আশ্রয়, আছে শ্রম, আছে মুনাফা সরিয়ে নেওয়ার পথে কোনো বাধা না রাখার আশ্বাস। এসবের মাথায় আছে অনুগত রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

কোম্পানিরা আসছে, বিনিয়োগ করছে, বিনিয়োগের জায়গা বাছাই চলছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শুরু হচ্ছে প্রতিযোগিতা। কেবল খেয়াল রাখা হচ্ছে, এই হুড়োহুড়িতে সবেমাত্র দাঁড় করানো কাঠামো যেন হুড়মুড় করে ভেঙে না পড়ে। এক দফায় লুট চলল বিনিয়োগ নিরাপদ করার আইন না মেনে, আক্ষরিকভাবেই লুট। কিন্তু তাতে কিছু বিনিয়োগকারীর অসুবিধা হয়। তাছাড়া ও পথে লুট পুরোমাত্রায় করা যায় না। তাই আয়োজন হয় গৃহযুদ্ধের আগুন নেভানোর। সে কাজে জাতিসংঘের সাহায্যও পাওয়া যায়। জাতিসংঘ শান্তি কায়েমের যে কাজটি করে দেয়, তার খরচ পড়ে কম। এ হিসাবও করেছে বার্তা সংস্থাগুলো। সব ঠিকঠাক চললে, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে মুনাফা আহরণের হার খারাপ হয় না; গায়েও লেপ্টে থাকে না লুটেরার লেবাস।

কিন্তু পুঁজির প্রতিযোগিতা চলে। স্থিতাবস্থার কাঠামোর মধ্যেই চেষ্টা চলে প্রতিযোগিতার মীমাংসা করার। গোপন থাকে না বহু বিষয়। ফলে খবর বেরোয় : ব্রিটিশ তেল কোম্পানি টাল্লো ও ব্রিটিশ দূতাবাস বিতর্কিত চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে কঙ্গো হারাতে পারে ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলার। বিতর্কিত এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেয় তেল বিষয়ে নজর রাখে এমন একটি সংগঠন। এ সংগঠনের নাম প্ল্যাটফর্ম।

এ কাজে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ছিল আফ্রিকান ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি গভর্নেন্স। চুক্তিটি হচ্ছে প্রডাকশন শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি। প্ল্যাটফর্ম এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বিশ্লেষণও প্রকাশ করে। এ বিশ্লেষণে বলা হয় : অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করা হয় চুক্তি মারফত। এর খেসারত দেবেন কঙ্গোর গরিব মানুষ। টাল্লোর চুক্তি বহাল হলে যে হাজার কোটি ডলার রাজস্ব সরকার হারাবে, সেটা দেশটির পুরো জাতীয় ঋণের সমান। এ চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য টাল্লো এবং কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় ব্রিটিশ দূতাবাস জোর লবিং বা দেনদরবার করছে। চুক্তিটি সম্পাদিত হলে আফ্রিকার সব চেয়ে গরিবদের একাংশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ হস্তান্তরিত হবে ব্রিটিশ ও আইরিশ বিনিয়োগকারীদের কাছে। এ বিশ্লেষণ ছাড়াও প্ল্যাটফর্ম পরিকল্পিত চুক্তিটির কয়েকটি দিক তুলে ধরে, যা কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণীয় নয়। যেমন তেল কোম্পানিগুলো ও সশস্ত্র উপদলগুলোর মধ্যে দোস্তি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে আবার শুরু করবে সম্পদ দখলের লড়াই; প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে ফেলার আইনসম্মত অধিকার প্রদান; পরিবেশের কোনো ক্ষতি হলে দন্ড প্রদানের ব্যবস্থা একটুও নেই এবং চুক্তির এমন একটি ধারা, যা কঙ্গোর পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধা দেবে। এগুলো রয়েছে চুক্তির ২১, ২৪, ২৬, ২৭ ও ৩৩ পৃষ্ঠায়।

এমন আরো উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রতিযোগিতায় অনেক সময় স্বচ্ছতা থাকে না। যেমন দেশটির পূর্বাঞ্চলে ১ ও ২ নম্বর ব্লক দেওয়া হলো দুটি কোম্পানিকে। এ দুটি কোম্পানি মিলে গঠন করতে চলেছে স্থানীয় একটি কোম্পানি। এতে দু’কোম্পানির মালিকানা থাকবে ৮৫ শতাংশ আর কঙ্গো রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে ১৫ শতাংশ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এতে কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি কোহাইড্রোর কোনো অংশ নেই। সেই সঙ্গে বিদেশী কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগকারীদের পরিচয় জানানো হচ্ছে না। আবার এ দুটি কোম্পানি শুরু করেছিল একটি ট্রাস্ট। কোম্পানি দুটির একটি হচ্ছে লগ্নি বিনিয়োগকারী, অপরটি হচ্ছে শিল্প বিনিয়োগকারী। জেনেভার যে আইনজীবী এ কোম্পানি দুটির প্রতিনিধি এবং ট্রাস্টটি পরিচালনা করেন, তিনি পাওয়ার অব এটর্নি সংক্রান্ত কাগজপত্র হস্তান্তর করেছেন যাদের কাছে, তাদের আবার কোম্পানি দুটিতে কোনো অংশীদারিত্ব নেই। রয়টারের এক খবর বলা হয়, এ দুটি ব্লকের জন্য চুক্তি করেছে টাল্লো। সঙ্গে আছে হেরিটেজ ও কোহাইড্রো।পুরো ব্যাপারটি হয়ে উঠেছে বড্ড ঘোরপ্যঁাচের।

পুঁজির জগতই এমন। আইনের ছায়ার নিচে আশ্রয় নিয়ে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে নানা দেওয়া-নেওয়া হয়, যা আইনের হাতে ধরা পড়বে না। আর এমন ঘোরালা-প্যঁাচালো দেওয়া-নেওয়া সহজ হয় অস্বচ্ছতার আবরণে। এ অস্বচ্ছতার আবরণ বিষয়গুলোকে জনসাধারণের চোখের আড়ালে রাখতে সাহায্য করে। একদিকে রাখা হয় ঘোরপ্যাচ, আরেক দিকে অস্বচ্ছতা। ফলে ‘আইনসম্মতভাবে’ লুটের কাজটি হয় সহজ।

এ ব্লক দুটিতে অর্থাৎ ১ আর ২তে ইতালির বড় তেল কোম্পানি এনিরও আগ্রহ রয়েছে। ফলে হয়তো আবার হবে লেনদেন এনির সঙ্গে ওই দু’কোম্পানির, কঙ্গোর তেল প্রবাহিত হবে নল দিয়ে, তেল বিক্রির মুনাফা উঠবে কয়েকজনের ঘরে এবং কঙ্গোর মানুষ এত কান্ডের কিছুই জানবেন না।

কঙ্গোতে স্বার্থ অনেকেরই। তেলের খোঁজ যতই পাওয়া যাচ্ছে, ততই স্বার্থ গভীর হচ্ছে, বাড়ছে আগ্রহ। কেবল প্রধান প্রধান শক্তিধর দেশ নয়, অন্যান্য দেশেরও স্বার্থ রয়েছে। কঙ্গোতে ২৫টি আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে কানাডার খনি কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। দেশটিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোর খনি কোম্পানি। এ তথ্য মার্কেটলাইন বিজিনেস ইনফরমেশন সেন্টারের, এংলোগেল্ডি অশান্তির এবং বিভিন্ন কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের। এসব কোম্পানির বিনিয়োগ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ লাখ কোটি, লাখ কোটি ডলার। গৃহযুদ্ধের অস্থিরতায় এত বিনিয়োগ সম্ভব ছিল না। হানাহানি সংঘাতের ডামাডোলে সরাসরি লুট সম্ভব। শ্রমকে শৃঙ্খলে বেঁধে সম্পদ তুলে, অতিরিক্ত শ্রম আত্মসাৎ করে মুনাফা ঘরে তুলতে দরকার হয় স্থিতিশীলতা, কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা শান্তি। এ স্থিতিশীলতা, এ শান্তি পুঁজির, মুনাফার, বাড়তি মেহনত আত্মসাতের। মেহনতের প্রসঙ্গ আসছে এ কারণে যে, মেহনত যোগ না হলে মাটির গভীর থেকে কোনো সম্পদ তোলা হতো না। খনির গর্ভ থেকে সম্পদ আহরণে কল বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সে কলও তো চালায় মেহনত, মানুষের মেহনত।

এত অর্থ যেখানে বিনিয়োজিত হয়, সেখানে আরো অর্থের উৎস রয়েছে। আর এত কোম্পানির এত অর্থ সেখানে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রেষারেষি উৎস হিসেবেও কাজ করে। আইনের কাঠামোর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতার, ভাগাভাগির মীমাংসা না হলে সে মীমাংসা হয় আইনের কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-রীতির বাইরে। তখনই রাজনীতিতে আসে হানাহানি পিছু পিছু আসে রক্তপাত। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে খনির কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা এ বছরের গোড়ার দিকে তা তুলে নেন। ফলে কাজ শুরু হবে খনি থেকে সম্পদ আহরণের; শুরু হবে প্রতিযোগিতা, লেনদেন; তৈরি হবে আগামীর হানাহানি, রক্তপাতের পটভূমি। হয়তো গজিয়ে উঠবে নতুন নতুন বিদ্রোহী গ্রুপ। সব কিছুর আড়ালে থাকবে পুঁজির হাত।

কঙ্গোর ৫ নম্বর ব্লকে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি (উভাচু) করেছে ডোমিনিয়ন পেট্রোলিয়াম, সঙ্গে আছে সোকো ইন্টারন্যাশনাল ও কোহাইড্রো। এ খবরও বার্তা সংস্থা রয়টারের। উগান্ডা সীমান্তে এ ব্লকে  তেল তোলা নিয়ে উগান্ডার সঙ্গে কঙ্গোর রয়েছে রেষারেষি। কঙ্গোর আটলান্টিক উপকূলে দুটি উভাচু করেছে শিওরস্ট্রিম নামের এক কোম্পানি। এ কোম্পানির প্রধান হচ্ছেন সেনেগালের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি এর আগে কঙ্গোয় শান্তি আলোচনায় সাহায্য করেছিলেন। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট এক ডিক্রি বলে এ চুক্তির ব্যবস্থা করেন। লেনদেনটি চমৎকার নয় কি?

কঙ্গোয় আরো তেলের ও গ্যাসের খোঁজ চলছে। তেল কোম্পানিগুলো ধারণা করছে ভালো মানের অনেক তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে; হয়তো তা হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি তেল-গ্যাস মজুদগুলোর অন্যতম। ফলে দেশটির আশপাশে দূরদেশী প্রভুর সৈন্যদের আনাগোনার খবরে কেউই অবাক হবেন না। কঙ্গোর মানুষও আশ্চর্যবোধ করবেন না। তেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো কঙ্গোর জনগণের বিধিলিপি এ মুহূর্তে রচিত হচ্ছে কোনো দূর দেশের রাজধানীতে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, তেল কোম্পানির সদর দফতরে, হয়তো কোনো সেনানায়ক ছক তৈরি করছেন সেনা মোতায়েনের। সম্পদ কি তা হলে দুর্ভোগ-রক্ত-কান্না ডেকে আনে?

Thursday, October 27, 2011

কঙ্গোর সংঘাত ও লুটের মাল কোলটান (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৭)

কঙ্গোতে লুটের ‘কাহিনী’ বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয় : সেখানে সংঘাতের ধরনটি লোভনীয়। এ কারণে এ সংঘাত বিবদমান সব পক্ষের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শত্রুরা, বৈরী পক্ষগুলো ব্যবসায়ের শরিক, খনিতে মজুর হিসেবে কাজ করতে হয় বন্দিদের। শত্রুরা একই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অস্ত্র পায়, অস্ত্র বেচাকেনার মধ্যস্থতাকারীরাও একই। ব্যবসা আড়াল করে ফেলেছে নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে। এ ব্যবসা-উদ্যোগে লোকসান হয় কেবল কঙ্গোর জনগণের।

ওপরে উল্লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে সব পাঠকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে কঙ্গোয় লুটের সত্য। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের উপসংহারে আরো নিষ্ঠুর সত্য উচ্চারিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে : এ সংঘাতের ধরন লোভনীয়। তাই বিভিন্ন দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদেরও এ সংঘাত দরকার। এর ফলে সম্পদ নাগালের মধ্যে আসে, এ কমান্ডাররা উপলব্ধি করেছেন যে, যুদ্ধ নিজেই নিজেকে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই এ যুদ্ধ অপরাধীদের জাল তৈরি করেছে।

এতে বলা হয় : দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দাতারা কঙ্গোয় অবস্থানরত সেনাবাহিনীগুলোর সরকারগুলোকে বিভ্রান্তিকর ইঙ্গিত দিয়েছে। এসব উপসংহার স্পষ্টভাবে বলে দেয় কঙ্গোর সম্পদ লুটের সঙ্গে সংঘাতের সম্পর্ক, স্পষ্টভাবে বলে দেয় সম্পদ লুটের সঙ্গে কোন কোন পক্ষ জড়িত। এবং এ মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করেন কোনো দলীয় বা কোনো দেশের পক্ষ অনুযায়ী দেশ নয়, তা করেন জাতিসংঘের একদল বিশেষজ্ঞ। রুয়ান্ডার মধ্য দিয়ে কঙ্গোর খনিজ সামগ্রী আমদানি করে বিভিন্ন দেশের কোম্পানি। রুয়ান্ডার রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাওয়া আংশিক তথ্য থেকে দেখা যায় এসব কোম্পানি হচ্ছে নিম্নোক্ত দেশগুলোর : বেলজিয়াম, জার্মানি, রুয়ান্ডা, মালয়েশিয়া, কানাডা, তাঞ্জানিয়া, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয় : এ লুটের কাজে অাঁতাত রয়েছে সরকারের সঙ্গে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতের। এতে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাংকের, মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। দেখা যায় যে, লুটের কাজে ব্যবহারের জন্য কোনো কোনো দেশ জাল মার্কিন ডলার ছাপে। প্রতিবেদনে বলা হয় : এ লুটের কাজে রাজনৈতিক বৈধতা যোগায় কোনো কোনো উন্নত দেশ। এতে বিশ্বব্যাংকের নাম উল্লেখ করে ১৮৮ নম্বর প্যারাতে যা বলা হয় তার সারকথা দাঁড়ায় এটাই যে, এ লুটের কথা বিশ্বব্যাংক জানে, বিশ্বব্যাংক জানে এ লুট উগান্ডার ও রুয়ান্ডার অর্থনীতিতে কোন ধরনের প্রভাব ফেলে। কিন্তু এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ছিল নীরব।

মজার ব্যাপার হচ্ছে লুটের অর্থের বিপুল অংশ ব্যয় হয় অস্ত্র কেনায় এবং অস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে লুটের কাজ দ্রুততর করা হয়। এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়। লুট থেকে পাওয়া অর্থের শেষ গন্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই গন্তব্য অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আর যুদ্ধ চালানোর অর্থ ও অস্ত্র কোন কোন পন্থায় আসে? প্রতিবেদনে বলা হয় : এটা চলে তিনভাবে। এগুলো হলো : এক. সরাসরি অর্থ দিয়ে কেনা হয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম; দুই. বিনিময়; অর্থাৎ খনিজ সামগ্রীর বিনিময়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়; এবং তিন. যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।

জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা এটাও দেখেন যে, সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর সেনাবাহিনীর জন্য বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ, প্রকৃত খরচ তার চেয়ে বেশি। কিভাবে আসে এ অর্থ? উত্তর সহজ : লুট।

প্রতিবেদনটির আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে কঙ্গোর এ সংঘাতে লুটে জড়িত কয়েক ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা। এ ব্যক্তিবর্গ রাজনৈতিক নেতা নন; কিন্তু ঘটনার নায়ক বা নায়িকা। এদের একটি তালিকা পেশ করে প্রতিবেদনে বলা হয় : এ তালিকা পরিপূর্ণ নয়। লুটে ও সংঘাতে এ নায়ক-নায়িকাবৃন্দ সরাসরি জড়িত। এদের নাম মেজর জেনারেল সলিম সালেহ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেমস কাজিনি, কর্নেল টিকামানিয়ার, কর্নেল উতাফায়ার, জনাব খলিল, জনাব আবদুর রহমান এবং এমন আরো।

প্রতিবেদনে এদের কান্ডকারখানার কম-বেশি উল্লেখ করা হয়। মেজর জেনারেল সালেহ ও তার স্ত্রী কহোয়া উগান্ডা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের মূল চরিত্র। সালেহ উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির ছোট ভাই বা কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তার ডান হাত ব্রি জে কাজিনি। তিনি রক্ষা করেন নিয়মবিসি ও তিবাসিমাকে। আর এ দু’জন রক্ষা করেন তার বাণিজ্য। সে বাণিজ্য হীরা, কাঠ, কফি, সোনার।

এভাবে একের পর এক বিবরণ পড়লে পাঠকের কাছে মনে হতে পারে যে, তা রহস্য উপন্যাসকে যেন ম্লান করে দিচ্ছে।

এ প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে এক নারীর নাম। তিনি যেন নায়িকা। তিনি আজিজা কুলসুম গুলাম আলি। (বাংলায় আমরা হয়তো লিখতাম ‘গোলাম আলি’)। মিসেস গুলাম আলির কয়েকটি পাসপোর্ট। তিনি থাকেন কখনো বুকাভুতে, কখনো ব্রাসেলসে, কখনো বা নাইজেরিয়াতে। ব্যাপারটি নির্ভর করে তার কাজের ওপরে। এ মিসেস ইতিপূর্বে বুরুন্ডিতে গৃহযুদ্ধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বুরুন্ডিতে একদল ‘বিদ্রোহী’কে অস্ত্র ও অর্থ যোগান দিয়েছিলেন। এর পরে, তিনি নতুন জোট গড়ে তোলেন রুয়ান্ডার সরকারের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন কিগালি সরকারের বড় মিত্র। মিসেস গুলাম আলি রুয়ান্ডা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সোনা, কোলটান ও ক্যাসিটেরাইট ব্যবসায়ে জড়ান। এর আগে তিনি জড়িয়ে ছিলেন বুরুন্ডির হটুদের সুবিধার্তে অস্ত্র, সোনা ও গজদন্ড চোরাকারবারে। সিগারেট চোরাচালানেও তার নাম শোনা যায়। বেআইনি ব্যবসাকে তিনি আড়াল করতেন তার সিগারেট ফ্যাক্টরি দিয়ে। সে কারখানা আজ লাটে উঠেছে। কোলটান ব্যবসায়ে তার খদ্দেরদের মধ্য রয়েছে স্টার্ক, কোগেকম, সোগেম। বড় দুটি ব্যাংক তার আর্থিক লেনদেনের কিছুটা সামাল দেয়। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা কয়েকবার অনুরোধ জানালেও বেগম গুলাম আলি তাদের সঙ্গে দেখা দেখা করেননি। এ প্রতিবেদন রচনাকালে কোলটান রফতানি ব্যবসায়ের একচেটিয়া আয়োজনের প্রধান হয়ে ওঠেন তিনি। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জাল নোটও তৈরি করেন। তিনি শুল্ক সংক্রান্ত কাগজপত্র জাল করেন। তিনি বলেছেন, ‘এ ব্যবসায়ে সবাই এটা করে।’ বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন কোলটান রফতানির কোম্পানিগুলোর মধ্যে জুয়াচুরি ব্যাপক।

এসব কর্মে এক শ্রেণীর ব্যাংকও যুক্ত। জাতিসংঘ প্রতিবেদনে এদের নাম ও কাজের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এতে জড়িত এক শ্রেণীর বিশাল কোম্পানি। এগুলো সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। এ লুটের কাজ সহজ করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রশাসনিক কাঠামোও সাজানো হয় উপযুক্তভাবে। কখনো ভিন দেশের প্রশাসনিক প্রধানপদে আসীন করা হয় কঙ্গোর লোককে। তার কাজ হবে স্বদেশে লুটের কাজ সংগঠিত করা।

আর শ্রম? সে তো বিশ্বজনীন। শৃঙ্খলিত শ্রমকে নিয়োগ করা হয় পৃথবীর গভীর থেকে সম্পদ তুলে আনতে। শিশু শ্রমও রেহাই পায় না। লুট কতটুকু, কেমন পরিমাণ হয়? জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনেই উত্তর খোঁজা যাক। প্রতিবেদন বলেছে : ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৯৯৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিদেশী সেনা দলগুলোর দখল করা কঙ্গোর এলাকাগুলো থেকে খনিজ সম্পদ, কৃষিজ ও বনজ সামগ্রী, গবাদিপশু লুটে নিঃশেষ করা হয়েছে; যাকে ইংরেজিতে অভিহিত করা হয়েছে ড্রেইনড অফ। বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, উগান্ডা যে দেশই হোক, লুটের ধরন এক। একজন অফিসারের নেতৃত্বে একদল সৈন্য আসে খামার, গুদামে, কারখানায়, ব্যাংকে, তারা আদেশ দেয় দরোজা খুলে দিতে। সেনারা লুটের মাল তোলে গাড়ির পর গাড়িতে। লুটের মাল নিয়ে গাড়ির বহর চলে যায়। কঙ্গোর একটি অঞ্চলে ১৯৯৮ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালে এপ্রিলের মধ্য ২০০০-৩০০০ টন ক্যাসিটেরাইট ও ১০০০-১৫০০ টন কোলটান লুটে নেওয়া হয়। সৈন্যদের পাহারায় বস্তা বস্তা অর্থ নেওয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে, লুটের অাঁতাত অনেক বিস্তৃত, ব্যক্তি মালিক থেকে রাষ্ট্র, ‘বিদ্রোহী’ থেকে ব্যবসায়ী, সেনানায়ক থেকে অস্ত্র নির্মাতা, সবাই আছে এ কাজে মিলেমিশে। এরাই কি সব? এদের আড়ালে কি কেউ নেই। কোন সে সুতো, যা এদের সবাইকে বেঁধে রাখে এক সঙ্গে? সে কি ধনলিপ্সা, লোভ? সে কি ‘আরো আরো চাই, যত পাই, তত চাই?’ স্থানাভাবে সবের বিবরণে না গিয়ে কেবল কোলটানে কান্ডটাই দেখা যাক। এন্টয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ম্যারিজ ২০০২ সালে রাইজ অ্যান্ড ডিক্লাইন অব দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম বিষয়ে সম্মেলনে পেশ করেন প্লান্ডার, ক্রিমিনালাইজেশন অব দ্য স্টেট অ্যান্ড ডিক্লাইন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম : দ্য কেস অব ডি আর কঙ্গো শিরোনামে প্রবন্ধ। এতে তিনি ছক কেটে দেখান যে, খনি আর নদীর বুক থেকে মজুররা তুলে আনেন কোলটান। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সামরিক চক্রের হাত ঘুরে তা পেঁŠছায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে এবং সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর হাতে। সেগুলো পেঁŠছে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে প্রক্রিয়াকরণ কারখানার ভেতর দিয়ে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো নাম নিয়ে তা হাজির হয় সূক্ষ্ম প্রযুক্তির শিল্পে। এ সামগ্রী প্রক্রিয়ার কারখানা জগতে রয়েছে গোটা বিশেক কাজাখস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রে, জার্মানিতে, চীনে, জাপানে। এগুলোর মধ্যে মাত্র চারটি কারখানা বানাতে পারে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো। সে চারটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, জাপানে, জার্মানিতে, চীনে। আর সূক্ষ্ম প্রযুক্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আলকাটেল কমপ্যাক, ডেল, এরিকসন, এইচপি, আইবিএম, নকিয়া, সিমেন্স, লুসেন্ট, মটোরোলা। বড় চেনা নাম এগুলো। এই চেনা নামের কোম্পানি সব কোটি কোটি খদ্দেরের কাছে পেঁŠছে দেয় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, গেম বা খেলার ডিজিটাল সামগ্রী।

এসবের মাঝে থাকে পরিবহন, ব্যাংক, রাজনীতি, বিধি, শুল্ক, বিশ্ব শক্তি। ডেনা মন্টেগু ২০০২ সালে স্টোলেন গুডস : কোলটান অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ইন দ্য ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন : রোয়ান্ডা ও উগান্ডাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন।

এসবে আরো মিশে থাকে : রক্ত। আরো থাকে : মেহনত, মজুরদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে নেওয়া মেহনত। আর সব শেষে থাকে মুনাফা। কতিপয়ের পকেটে, অ্যাকাউন্টে। সে কতিপয় প্রমোদতরীতে চড়ে ঘুরে বেড়ায় ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপ থেকে দ্বীপে, ক্যারিবিয়ানের সূর্যাস্ত রং মেখে দেয় তাদের চোখে। কোলটানের রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর, ‘সুন্দর’ যাত্রা!

কোলটান থেকে কে কত পায়? এ হিসাব করা প্রায় ধাঁধার উত্তর খোঁজার মতো। কারণ, তথ্যগত বিভ্রান্তি বেশি। একজন গবেষক এ সংক্রান্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে অনুমান করেছেন যে, স্থানীয় বেপারী ১০ ডলার পেলে রুয়ান্ডার ব্যবসায়ী পায় ২০০ ডলার, আর পাঁচ-ছয়জন খনিমজুরের একেকটি গ্রুপ পায় সপ্তাহে ৩০ ডলার। অর্থাৎ দিনে একজন পায় ১ ডলারের কম। আহরণের পরে ৩০ কিলোগ্রাম সামগ্রী বস্তায় ভরে হেঁটে হেঁটে তা নেওয়া হয় স্থানীয় ব্যবসায় কেন্দ্রে, গড়ে ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে। সোনা, হীরা লুটের ঘটনা আরো নিষ্ঠুর। তবে লুটের ধরন একই। সে বিষয়ে আর আলোকপাত না করে আগামীতে দেখা যাবে আরো লোভনীয় ক্ষেত্রে কেমন ঘটনা ঘটে চলেছে।

Friday, October 21, 2011

যুদ্ধে জড়িত কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি

মবুতুর পরে ক্ষমতায় বসানো হলো লরেন্ট কাবিলাকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ অনুগত মিত্র। কাবিলা প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে, ১৯৯৭ সালে একজন প্রতিনিধি পাঠালেন কানাডার টরেন্টোতে। উদ্দেশ্য : বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। কাবিলার বাহিনী গোমা দখলের পর পরই, ১৯৯৭ সালে, আমেরিকান মিন্যারাল ফিল্ডস (এএমএফ) নামের কোম্পানি কাবিলার সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এ এলাকায় দস্তা, তামা ও কোবাল্ট খনিগুলো থেকে খনিজ সম্পদ আহরণের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয় এএমএফকে। এ কোম্পানির প্রধান ছিলেন মাইক ম্যাকমরো। মাইক আবার যুক্তরাষ্ট্রের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বন্ধু। আর এ চুক্তি সম্পাদনে কাবিলার পক্ষে আলোচনা করেছিলেন কঙ্গোর যে লোকটি, তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে আগেই উল্লেখ করা ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে।

ঘটনা, সম্পদ লুটের ঘটনাগুলো খেয়াল করে দেখলে এভাবে বন্ধুত্ব, যোগসাজশ, ইত্যাদি চোখে পড়ে। হানাহানি, হামলা, যুদ্ধ চলতে থাকল। এ সবে সামনাসামনি জড়িয়ে থাকল উগান্ডা, রুয়ান্ডা প্রভৃতি দেশ; আড়ালে রইল বহুজাতিক করপোরেশন (বক), আর বকদের আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র শক্তিগুলো। উগান্ডা ও রুয়ান্ডা চেয়েছে স্ব স্ব দেশের সীমান্ত বরাবর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে। কাবিলা গোটা দেশ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। উপরে উল্লেখিত বইতে বলা হয়েছে, কাবিলার সেনাবাহিনী ও বিরোধী কোঙ্গোলিজ র‌্যালি ফর ডেমোক্র্যাসি নামের বাহিনীকে, দু’পক্ষকেই মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে সংঘাত বেড়েছে, দেশটির অস্থিতিশীলতা বেড়েছে; ফলে বিদেশী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার জন্যই সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়েছে দেশটিকে স্থিতিহীন রাখার।

রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; রুয়ান্ডার সৈন্যদের ও বিদ্রোহী সশস্ত্র দলগুলোকে যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো সেনারা। রুয়ান্ডা কঙ্গোতে সেনাবাহিনী পাঠানোর আগে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট সফর করেছিলেন পেন্টাগন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর। এমনকি, এ সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে রুয়ান্ডা কঙ্গোয় অভিযান শুরু করার আগেই, ১৯৯৮ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই কঙ্গোতে ঢুকে পড়া রুয়ান্ডার সৈন্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দেখা গেছে। আগে উল্লিখিত ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে এসব তথ্য রয়েছে।

এদিকে, কঙ্গো-রুয়ান্ডা সীমান্তে রুয়ান্ডার সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে দেয় সামরিক বিষয়ে ঠিকাদার কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে কোম্পানি। এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি হ্যালিবার্টনের সাবসিডিয়ারি। এ ঘাঁটিতে রুয়ান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আবার, উপগ্রহের মাধ্যমে সংগ্রহ করা মানচিত্র ও ছবি কাবিলাকে যোগান দেয় বেকটেল করপোরেশন। এগুলো কাবিলাকে দেওয়া হতো যাতে মবুতুর সৈন্যদের চলাচলের হালনাগাদ খবর ও অবস্থান কাবিলা জানতে পারেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি বেকটেলয়ের পরিচালকমন্ডলীতে বা প্রধান পদে যারা আছেন/ছিলেন, তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন। এদের মধ্যে জর্জ শুলজ, কাসপার ওয়েইনবার্গার প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। আবার, ডিক চেনি এক সময়ে ছিলেন হ্যালিবার্টনের প্রধান। কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুটয়ের মালিক আবার হেলিবার্টন, কেইথ হারমন স্নো ‘দ্য ওয়ার দ্যাট ডিড নট মেক দ্য হেডলাইনস : ওভার ফাইভ মিলিয়ন ডেড ইন কঙ্গো’ প্রবন্ধে লিখেছেন : মানবাধিকার বিষয়ে দলনিরপেক্ষ একজন তদন্তকারী দেখেছেন যে, মিলিটারি প্রফেশনাল রিসোর্সেস ইনকরপোরেটেড এবং কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি দুটির সঙ্গে পেন্টাগনের সম্পর্ক রয়েছে।

এবার লুটের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি। তার ভাই সলিম সালেহ। তিনি তিনটি বিমান ইজারা দিলেন উগান্ডার সামরিক বাহিনীকে। এ বিমানগুলো কঙ্গোতে সৈন্য ও সামগ্রী সরবরাহের কাজে লাগানো হলো। উগান্ডার সেনা কর্তাবৃন্দ, কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলো ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগসাজশে সালেহ নিশ্চিত করলেন যে, ফেরত পথে বিমানগুলো যেন বোঝাই থাকে সোনা, কাঠ, কফি দিয়ে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। রুয়ান্ডায় হীরা খনি নেই। অথচ রুয়ান্ডা ১৯৯৮ সালে ১৬৬ ক্যারেট হীরা রফতানি করে। আর তা ২০০০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৫০০ ক্যারেটে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। পাশ্চাত্যের বিশাল খনি কোম্পানি বারিক গোল্ড করপোরেশন। এটি কানাডীয় কোম্পানি। কঙ্গোর খনি সম্পদে এ কোম্পানির রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। এ কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর পরিচয়? কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরোনে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উপদেষ্টা ভার্নন জর্ডান। এ কোম্পানির উপদেষ্টাদের একজন হচ্ছেন জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ, যাকে সংক্ষেপে জর্জ ডব্লু বুশ বা জর্জ বুশ নামে পৃথিবীর মানুষ চেনেন।

কঙ্গো থেকে সুবিধা পেয়েছে যেসব কোম্পানি, সেগুলোর অন্যতম কানাডার হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। উগান্ডা আর রুয়ান্ডার সামরিক বাহিনী ১৯৯৮ সালে যখন কঙ্গোর মাটিতে পা রাখল, সে সময়েই সেখানে পৌঁছায় হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ব্যাংক পাঁচ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ডলার কর্জ দেয় কঙ্গোয় রুয়ান্ডা সমর্থিত বিদ্রোহী দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। আর, রুয়ান্ডা ও উগান্ডা যখন কঙ্গোয় লুট চালাচ্ছে, সে সময়েই এ দু’দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ছে বলে এ দু’দেশ প্রশংসা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের।

উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলো পরিবেশিত হয়েছে ইতোমধ্যে উল্লেখ করা এ গেম এজ অ্যান্ড… বইতে। সত্য যে কোথায় কোনটি, তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের তথ্য বিপুল। একের পর এক এসব তথ্য সাজালে সহজেই কয়েকটি বই লেখা যায়। এসব তথ্য যথাযথভাবে সংযুক্ত করলে, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক খুঁজে পেলে সত্য আর আড়ালে থাকে না। লুট, হামলা, পেছনে থাকা শক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতির ভালো ভালো কথা, লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার সম্পর্ক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক, ইত্যাদি সত্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। তখন আর বিভ্রান্তি থাকে না এ পৃথিবীর বড় শক্তিদের চেহারা-চরিত্র-বক্তব্য নিয়ে। তবে, এক বিপুল আশ্চর্য তবুও অপেক্ষা করে। সে বিপুল আশ্চর্য হচ্ছে : আজো দেশে দেশে এ শক্তিবর্গের মিত্ররা পরম শ্রদ্ধায় পূজা পান। তারাও ভেবে দেখেন না যে, দেশের সাধারণ মানুষ যেদিন জানতে পারবেন এ পূজনীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এ শক্তিবর্গের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা, সেদিন সাধারণ মানুষই ধিক্কার দেবেন এ ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিবর্গকে। আর, সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তা করেন না, মাঝে মধ্যে করেন। যেমন, আমাদের এ ভূখন্ডেই, আমাদের আজকের বাংলাদেশে, ১৯৪৭ সালের আগে-পরে কতই না শ্রদ্ধা পেতেন মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ। তাকে তো এ দেশেরই মানুষ ধিক্কার দিয়েছেন, প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার কথার প্রতিবাদ করেছেন। কোনো কথাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখতে পারেনি। একইভাবে, দেশে দেশে লুটের সঙ্গে জড়িত যে রাষ্ট্র শক্তি, তার পরম মিত্র, তার আস্থাভাজন লোককে সাধারণ মানুষ কি গ্রহণ করবেন? ধিক্কারে-নিন্দায় উচ্চারিত হবে সে নাম। কারণ, সাধারণ মানুষ কখনোই দেশের সম্মান ও মর্যাদা বলি দেন না। কঙ্গোতেও তাই হয়েছে। বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র শোম্বের নাম আজ আর কেউ উচ্চারণ করেন না শ্রদ্ধায়, সে নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, ধিক্কারে। মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়ে আছেন প্যাট্রিস লুমুমবা।

কঙ্গোর দুর্ভোগের শেষ হয় না। কারণ তার সম্পদ কেবল সোনা, হীরা, কোবাল্টে সীমিত নেই। সেখানে আছে তেল। সে তেলের পরিমাণ একেবারে কম নয়। তাই এ তেল নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং প্রতিযোগিতা প্রবল। ব্রিটেনের পত্রিকা ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায় : কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ৫ নম্বর ব্লক নিয়ে শুরু হয়েছে বিরোধ। এ ব্লকে রয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সেখানে রয়েছে বন, গরিলা, হাতি। এখানে রয়েছে মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো জাতীয় উদ্যান। এ ব্লকটি দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের দুটি তেল কোম্পানিকে। দেশটির আইন অনুসারে জাতীয় উদ্যানে কেবল বৈজ্ঞানিক কাজ চালানো যায়, তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন করা যায় না। দেশটির ৪১ জন এমপি জাতীয় উদ্যানের সীমানা নতুন করে চিহ্নিত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রীর কাছে। প্রতিবেশী উগান্ডায় যুক্তরাজ্যের আরেকটি কোম্পানি, তাল্ল অয়েল সন্ধান পেয়েছে আড়াইশ কোটি ব্যারেল তেলের। এর পর থেকেই তেল তোলার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এ ব্লকে তেল তোলার জন্য পার্টনারশিপ শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি করা হয়। এটা খুব গোপন করে রাখা হয়। এ চুক্তি অনুসারে সিগনেচার বোনাস হিসেবে উৎপাদন দেবে ২০ লাখ ডলার, প্রথম উৎপাদন বোনাস হিসেবে দেবে ২০ লাখ ডলার; আর, একটি বার্ষিক কর দেওয়ার পাশাপাশি এক কোটি ব্যারেল তেল কিনবে ৫০ লাখ ডলারে। মুনাফার ওপরে ভাগাভাগি আছে। এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। সে সংশোধন অনুসারে কিছু অর্থ আবার সিগনেচার বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়। কত পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে অনুমান করা হয়, এ পরিমাণ পাঁচ লাখ ডলার। এ অর্থ দেওয়া হয় চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করার কয়েক সপ্তাহ আগে।

এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তেল কোম্পানিগুলো যে অর্থ দেয়, তার চেয়ে বেশি নিয়ে যায়। তা না হলে এসব কোম্পানি তেল তুলতে আসত না। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দর্শন ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ নয়।

এ লুটের ‘কাহিনী’ বিশাল। তার ধরন অনেক। ব্যক্তি পর্যায়ে, কোম্পানি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে, আইনের ও প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায়, আইন ভেঙে লুট চলে। এ লুট এত ব্যাপক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০০০ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে বলে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন পেশ করেন তাতে এ লুটের একটি দিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

এ প্রতিবেদন ছয়টি উপসংহারে উপনীত হয়। প্রথম উপসংহারেই বলা হয় : গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সংঘাত প্রধানত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রাপ্তি, নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য নিয়ে। এ পাঁচটি খনিজ সম্পদ হলো কোলটান, হীরা, তামা, কোবাল্ট ও সোনা। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ এত যে হতবিহবল হয়ে যেতে হয়। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও আইনহীনতার প্রেক্ষাপটে এ সম্পদ মুঠো না করার প্রলোভন ঠেকানো কঠিন। দ্বিতীয় উপসংহারে বলা হয় : বিদেশী সেনাবাহিনীগুলো সুব্যবস্থিতভাবে কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করছে। তা লুট করা হচ্ছে। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। এসব চক্রের যোগাযোগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তৃতীয় উপসংহারের একটি অংশে বলা হয় : কয়েকটি কোম্পানি কঙ্গোতে যুদ্ধে জড়িত। এসব কোম্পানি যুদ্ধে সরাসরি ইন্ধন যুগিয়েছে। এসব কোম্পানি প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে অস্ত্র যুগিয়েছে। অন্য কয়েকটি কোম্পানি দিয়েছে অর্থ। সে অর্থ খরচ হয়েছে অস্ত্র কেনায়। খনিজ সম্পদের ব্যবসা করে যে কোম্পানিগুলো, তারাই দেশটিতে বেআইনিভাবে খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। লুটের এ কাহিনী আগামীতে আরো তথ্য দেবে।

Thursday, September 8, 2011

লিবিয়ায় আক্রমণ কেন? (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১০)

লিবিয়ার যুদ্ধের খবর কারো অজানা নয়। এ যুদ্ধের বিভীষিকা আর ভয়াবহতার খবর ও ছবি সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়, টিভির পর্দায়। এ বিবরণ আবার দেওয়ার দরকার পড়ে না। লিবিয়ার এ যুদ্ধ চালাচ্ছে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটো নামের সামরিক জোট। মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের বহু খবরে, তথ্যে, ছবিতে ন্যাটো নেতাদের ভাষ্যে, বক্তব্যে, দাবিতে এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। অনেক তথ্য আড়াল করে, অনেক তথ্য বিকৃত করে, তথ্য অতিরঞ্জন করে বানোয়াট তথ্য প্রচার করে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের বিপুল অংশ লিবিয়ায় ন্যাটোর  চালানো যুদ্ধকে দেখাতে চাচ্ছে ‘গণতন্ত্রের লড়াই’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ হিসেবে। কিন্তু এত কিছুর পরেও সত্য প্রকাশিত হচ্ছে। সে সত্য বলছে লিবিয়ায় যুদ্ধ চালাচ্ছে ন্যাটো।
ন্যাটো কেন এ যুদ্ধ করছে আর এ যুদ্ধের ধরন-ধারণ-চরিত্র কেমন- কি, তা বুঝতে পারা সহজ হবে নিচে উল্লেখ করা তথ্যগুলোর দিকে খেয়াল দিলে। এসব তথ্য যথাসম্ভব সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
১. ইন্ধন বিষয়ক সাময়িকী পেট্রোলিয়াম ইকোনমিস্ট এ বছরের ২৭ এপ্রিল একটি সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনাম হিসেবে লেখে : দ্য ওয়ার ফর লিবিয়াজ অয়েল অর্থাৎ লিবিয়ার তেলের জন্য যুদ্ধ। এ সংবাদ প্রতিবেদনটি পাঠান ডেরেক ব্রোয়ার, গাদ্দাফিবিরোধীদের নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চল থেকে।
২. রাশিয়া টুডেতে ২ এপ্রিল ২০১১ তারিখে সাংবাদিক সুসান লিনডরের যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তার শিরোনাম ছিল : ওয়ার ফর লিবিয়ান অয়েল প্ল্যানড লং এগো, নো ওয়ান কেয়ারস এবাউট পিপল অর্থাৎ লিবিয়ার তেলের জন্য যুদ্ধের পরিকল্পনা অাঁটা হয়েছে বহু আগে, জনগণের কথা কেউ ভাবে না।
সাংবাদিক লরেন নানা দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি মনে করেন না যে, মানবিক কারণে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তার যুক্তি : মানবিক কারণে হস্তক্ষেপ করা হলে, লিবীয় জনগণের কথা ভাবা হলে, এ হানাহানি অনেক আগে থেমে যেত।
৩. রাশিয়া টুডেতেই ৪ এপ্রিল আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল : ইললিগ্যাল ওয়ার ইন লিবিয়া ইজ সিআইএ রান, মিডিয়া শিলস কভার ফর ওবামা! হুইসব্লোয়ার সুসান লিনডর, লিবিয়ার বেআইনি যুদ্ধ সিআইএ চালাচ্ছে, ওবামাকে আড়াল করছে সংবাদ মাধ্যম, তথ্য ফাঁস করছেন সুসান লিনডর।
এভাবে আরো সংবাদ-প্রতিবেদনের উল্লেখ করা যায়, যেগুলোতে একই ধরনের তথ্য, যুক্তি ও বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত খবরের কাগজ টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেউই বলবেন না যে, তা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা যুক্তরাজ্যবিরোধী বা ন্যাটোবিরোধীদের দ্বারা রচিত। এ পত্রিকার ২২ আগস্ট ২০১১ তারিখের সংখ্যায় গর্ডন রেনার, টমাস হার্ডিং ও ডানকান গার্ডহ্যামের লেখা সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনাম লিবিয়া : সিক্রেট রোল প্লেড বাই ব্রিটেন ক্রিয়েটিং পাথ টু দ্য ফল অব ত্রিপোলি, লিবিয়া : গোপনে ব্রিটেনের ভূমিকা ত্রিপোলি পতনের পথ রচনা করছে। উল্লেখ করতে হয় যে, সংবাদ-প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরে বিষয়টি আর গোপন থাকেনি।
এ প্রতিবেদনে বলা হয় : সামরিক ও গোয়েন্দা কর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধীদের সাহায্য করছেন। রাজধানী ত্রিপোলিতে সমন্বিতভাবে আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের এ সাহায্য অনুযায়ী রাজকীয় বিমান বাহিনী অর্থাৎ ব্রিটিশ বিমান বাহিনী ২০ আগস্ট সকালে আক্রমণ জোরদার করে। এটি ছিল আগেভাগে করা পরিকল্পনার অংশ। গাদ্দাফিবিরোধীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিতে এ বিমান হামলা জোরদার করা হয়।
এ প্রতিবেদনে বলা হয় : গাদ্দাফিবিরোধীদের ঘাঁটি বেনগাজিতে অবস্থানরত ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্তারা গাদ্দাফিবিরোধী জোটের করা রণপরিকল্পনা আরো ধারালো বা ঘষামাজা করেন। এ পরিকল্পনার ব্যাপারে ১০ সপ্তাহ বা আড়াই মাস আগে মতৈক্য হয়। ব্রিটিশ বিশ্লেষকরা গাদ্দাফিবিরোধী নেতাদের অবিরাম রণকৌশলগত হালনাগাদ বুদ্ধি-পরামর্শ দেন। এ পরামর্শের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ত্রিপোলির ভেতরে নতুন করে ব্যাপক লোকজনকে বিক্ষুব্ধ করে তোলা। সেটাই হবে বিদ্রোহী লড়িয়েদের ত্রিপোলির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইশারা। ত্রিপোলিতে গাদ্দাফিবিরোধী লোকেরা মাথা চাড়া দেয় ২০ আগস্ট রাতে। আর রাজধানী ত্রিপোলি দখলের লড়াইয়ের প্রথম পর্ব শুরু হয় এর কয়েক ঘণ্টা আগে, ইংরেজ বিমান বাহিনীর টর্নেডো জিআরফোর বিমানের হামলার মধ্য দিয়ে। এগুলো হামলা চালায় ত্রিপোলির দক্ষিণ-পশ্চিমে যোগাযোগের প্রধান স্থাপনাগুলোতে। ওইদিন সকালে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে এমনভাবে পরিচালিত বোমা পেভওয়ে ফোর ফেলা হয় একটি গোয়েন্দা কেন্দ্রে। এর পরে বিমান আক্রমণ চালানো হয় ট্যাংকের ওপরে, কামানে, কম্যান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বা নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপনায়। এদিকে ত্রিপোলির ভেতরে গাদ্দাফিবিরোধীদের সংকেত দেওয়া হয় মাথাচাড়া দেওয়ার জন্য। সংকেত ছিল গাদ্দাফিবিরোধী জোট প্রধান জলিলের একটি বক্তৃতা সম্প্রচার করা। জলিলের বক্তৃতাটি সম্প্রচার করে কাতারে স্থাপিত টিভি কেন্দ্র লিবিয়া টিভি। এটি সম্প্রচারিত হয় ওইদিন বিকেলে। রাত ৮টা নাগাদ একদল গাদ্দাফিবিরোধীদের লড়িয়ে সুযোগ বুঝে নগর কেন্দ্রে বেন নবি মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেয়, মসজিদের মাইকে তারা স্লোগান দেয়, শুরু হয় অপারেশন মারমেড ডন (এ পর্যায়ের সাংকেতিক নাম)।
এতে বলা হয়, এর আগে ত্রিপোলির ৩০ মাইল দূরে লড়াইতে গাদ্দাফি ত্রিপোলি থেকে সৈন্য পাঠান। হয় তো গাদ্দাফির পরিকল্পনা ছিল সে যুদ্ধ শেষ হলে সেনাদের আবার বিন্যস্ত করা হবে, সজ্জিত করা হবে অস্ত্রে, যেমন প্রতিটি বড় লড়াইয়ের পরে তিনি করেছেন। কিন্তু সে লড়াইতে ব্যস্ত থাকার সময়েই ইংরেজ বিমানবাহিনীর টর্নেডো ও টাইফুন বিমানগুলো ত্রিপোলিতে আগে থেকে বাছাই করে রাখা লক্ষ্যবস্ত্তগুলোতে একের পর এক আঘাত করে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। ইংরেজ বিমান বাহিনীর ও সঙ্গী দেশগুলোর বিমান বাহিনীর বিমানগুলো ২১ আগস্ট ত্রিপোলিতে ৪৬ বার আঘাত হানে (অর্থাৎ প্রায় প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর চলে এ বিমান হামলা)। এসব হামলায় ব্যবহার করা হয় ভূমিতে আক্রমণ চালানোর ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিমস্টোন। এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বেসামরিক এলাকায় অবিশ্বাস্য নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। গাদ্দাফির বাংকারের ওপরে রাতভর আঘাত হানে বিমান। টর্নেডো বিমানগুলোতে যে উন্নত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা রয়েছে তা দিয়ে বিমান উড্ডয়ন অবস্থায়ই লক্ষ্যবস্ত্ত চিহ্নিত করে আঘাত হানতে পারে। এ ব্যবস্থাকে বলে ডায়নামিক টার্গেটিং। গাদ্দাফির কয়েকটি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল ফাঁকা স্কুলভবনে বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে। সেগুলোতে আঘাত হানা হয়। ফলে সৈন্যদের নির্দেশনা দেওয়ার সামর্থ্য নষ্ট হয়ে যায়।
টেলিগ্রাফেরই খবরে বলা হয়, ব্রিটেন গাদ্দাফিবিরোধীদের সাজসরঞ্জামে সজ্জিত করেছে। এ খবরের সত্যতা সমর্থন করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ। এসব সাজসরঞ্জামের মধ্যে ছিল টেলিযোগাযোগের উন্নত সরঞ্জাম, গোলাগুলি থেকে দেহ রক্ষায় ১ হাজার সেট বর্ম, রাতে অন্ধকারে দেখার ক্ষমতাবিশিষ্ট চশমা। গাদ্দাফিবিরোধীদের হাত থেকে ত্রিপোলি রক্ষার জন্য গাদ্দাফি একের পর এক আহবান জানান রাজধানীবাসীর প্রতি। বেতার ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বেতারে তার সে কণ্ঠস্বর শোনা যায় ভাঙা ভাঙা, মাঝে থাকে অন্যান্য শব্দ। তিনি নিজের কোনো ভিডিও ছবিও দেখাতে পারেননি। এর ফল দাঁড়ায় : গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি পালিয়ে গেছেন। যুদ্ধে হার হয়েছে ভেবে অনেক সৈন্য যেখানে ছিল সেখানেই রণপোশাক ছেড়ে সরে যায়। এ খবরও ইংরেজ পত্রিকা টেলিগ্রাফের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তার সরকারি বাসভবনে সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বসেন। আর বাসভবনের সামনে এসে সাংবাদিকদের কাছে লিবিয়ায় ঘটনাধারার জন্য রাজকীয় বিমান বাহিনীর বৈমানিকদের ‘অবিশ্বাস্য সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠা’র প্রশংসা করেন। তিনি বলেন : ‘এটা আমাদের বিপ্লব নয়। তবে আমরা পালন করেছি আমাদের ভূমিকা। সে জন্য আমরা গর্ববোধ করতে পারি।’ কোন অস্ত্রের বিপরীতে কোন অস্ত্র, কোন রণসজ্জার মোকাবিলায় কোন রণসজ্জা, কত সমর শক্তির বিপরীতে কত সমর শক্তি, সে বিচার পাঠক করবেন। সাহসিকতার তুলনা-প্রশংসা ইত্যাদিও পাঠক বিবেচনা করবেন। আর পাঠক বুঝবেন কেমন সে বিপ্লব, যাতে গর্ববোধ নিয়ে অংশ নেয় এ মহাশক্তিধররা একসঙ্গে জোটবেধে। সে কি বিপ্লব, নাকি স্বার্থ হাসিলের যুদ্ধ, যার গায়ে লেবেল মারা মানবিক হস্তক্ষেপ।
এ মহাশক্তিধরদের মদদের খবর আসে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির মাধ্যমে। বিবিসির ৪ জুন, ২০১১ তারিখে লিবিয়ার পশ্চিামাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলে গাদ্দাফিবিরোধীদের তৎপরতা বিষয়ক খবরে বলা হয় : এলাকার আকাশে ন্যাটোর বিমানগুলো চক্কর দিচ্ছে। সে শব্দ কানে আসে বিবিসি সংবাদদাতার। সেখানকার এক বাসিন্দা বলেন, ন্যাটো হামলা চালানোয় আমরা খুব খুশি। বিবিসির সংবাদদাতা জানান : আইন সেজালাতে গাদ্দাফি বাহিনীর অবস্থানে ন্যাটো বিমানগুলো হামলা চালিয়েছে। সেখানকার এক বাসিন্দা বিবিসি সংবাদদাতাকে বলেন : আমরা নির্ভর করি আমাদের সাহস আর ন্যাটোর ওপরে। পাঠকের বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় কার ওপরে ভর করে কার সাহস! আর ন্যাটোর উন্নত অস্ত্র বহরের বিবরণ সংক্ষেপে বলার নয়। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর যে গোয়েন্দা বিমান লিবিয়ার আকাশে চক্কর দিয়ে দিয়ে সদাসর্বদা নজর রেখেছে, তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাতে চড়ে লিবিয়ার আকাশে ঘুরে বিবরণ দিয়েছেন বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা ক্যারোলিন উইয়্যাট। সেনটিন্যাল আরওয়ান নামের এ বিমানের রাডার সরঞ্জাম কয়েক মিনিটে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা স্ক্যান করতে পারে, অর্থাৎ তন্ন তন্ন করে দেখে নিতে পারে। ভূমধ্যসাগরের ওপর তীরে সাইপ্রাস থেকে যাত্রা করে এ বিমান লিবিয়ার আকাশে পৌঁছায় কয়েক ঘণ্টায়। তার পরে প্রায় সাত মাইল ওপর থেকে রাডারের সাহায্যে ছবি তোলা হয় এ ধরনের পাঁচটি বিমান, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদির জন্য যুক্তরাজ্যের করদাতাদের ১০ বছরে খরচ হয়েছে ১ বিলিয়ন বা ১শ’ কোটি পাউন্ড।  এ একটি তথ্যই দেখিয়ে দেয় যুদ্ধের বিশাল আয়োজন, বিপুল ব্যয়।
বিবিসিরই ২২ আগস্ট ২০১১ তারিখের খবরে বলা হয়, বিমান হামলা জোরদার করার ফলে নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ মজুদখানা, বিশেষ করে বাব আল আজিজিয়া নামের প্রেসিডেন্ট বাসভবন চত্বর ধ্বংস হওয়ার খবর ন্যাটো সমর্থন করেছে। কেবল যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ফ্রান্সও গাদ্দাফিবিরোধীদের সশস্ত্র করে তোলে। বিবিসির  প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি বিষয়ক সংবাদদাতা জনাথন মারকাসের ২৯ জুন ২০১১ তারিখের এক প্রতিবেদনে জানানো হয় : লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে নফুসা পার্বত্য অঞ্চলে গাবিদের অস্ত্র যোগাচ্ছে ফরাসি সামরিক বাহিনী। প্যারাশুটের সাহায্যে বিমান থেকে গাদ্দাফিবিরোধীদের অবস্থানে ফেলা হচ্ছে অস্ত্র। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এসল্ট রাইফেল, মেশিনগান, রকেট লাঞ্চার। লা ফিগারো পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় : হয়তো ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মিলানও দেওয়া হচ্ছে তাদের। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে গাদ্দাফিবিরোধীদের অস্ত্র দিচ্ছে কাতার এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। এ ধরনের কিছু অস্ত্র আবার বিমানে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে গাদ্দাফিবিরোধীদের কাছে।
পাঠক হয়তো অবাক হচ্ছেন, অস্ত্রশস্ত্রের এ ‘কারবারে’ ফ্রান্সের নাম শুনে। কারণ কোনো কোনো পাঠক হয়তো ভাবছেন, এ দেশটিই কতো দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প-নাটক, নাচে কতোই সহায়তা যোগায়, এ দেশটির বেসামরিক সেরা পদকে ভূষিত করা হয় সত্যজিৎ রায়কে। এখানে সে বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়ে সংক্ষেপ উত্তর হবে : একেই বলে রাজনীতি! আর রাজনীতির গোড়া হচ্ছে অর্থনীতি। তবে আমাদের দেশের কোনো কোনো কলাম লেখক আক্ষেপের সুরে লিখে ফেলেন অর্থনীতির মধ্যে রাজনীতি ঢুকে গেছে। তারা বোঝাতে চান, এ দুটো আলাদা। তেমনভাবে দেখলেই ঘটনা বুঝতে সমস্যা হয়। যাই হোক, ফিরে যাই লিবিয়ার ন্যাটোর চালানো যুদ্ধের প্রসঙ্গে। ন্যাটোর লিবিয়া যুদ্ধের মোট খরচের হিসাব এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে ভবিষ্যতে মজার মজার খবর বেরুবে বলে ধারণা করা যায়।
তবে বিবিসি ২৭ জুন ২০১১ তারিখে জানায়, লিবিয়ায় সামরিক অভিযানে মার্চ থেকে যুক্তরাজ্যের খরচ হয়েছে ২৬ কোটি পাউন্ড। এ খরচের মধ্যে ছিল বিমান, ইত্যাদির সার্ভিসিং, জ্বালানি, ক্রু ও প্রশিক্ষণ, অবচয়, ইত্যাদি। পার্লামেন্ট, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, ইত্যাদি সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে অপারেশনাল খরচ ধরা হয়েছে ১২ কোটি পাউন্ড। এ খরচের মধ্যে রয়েছে ইটালিতে ১২টি টর্নেডো ও ছয়টি টাইফুন জঙ্গি বিমান ও সেগুলোর বৈমানিক এবং অন্যান্য কর্মী ও ভূমধ্যসাগরে নৌবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের রাখার খরচ। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ডুবোজাহাজ ট্রায়াম্প থেকে ১৫টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে লিবিয়ায়। সেখানে ইংরেজ বিমান সেনারা ছুড়েছে শত শত পেডওয়ে ও ব্রিমস্টোনসহ নানা ধরনের শত শত ক্ষেপণাস্ত্র। একটি ব্রিমস্টোন ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড, একটি স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৭৮ লাখ ৯০ হাজার পাউন্ড, একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৮ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১১ লাখ পাউন্ড। একটি পেভওয়ে গাইডেড বোমার দাম ২ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড, ট্রায়াম্প ডুবোজাহাজের প্রতিদিনের অপারেশন বা পরিচালন ব্যয় ২ লাখ পাউন্ড, রণতরী কাম্বারল্যান্ডের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ৯০ হাজার পাউন্ড, টাইফুন যুদ্ধ বিমানের উড্ডয়নকালীন প্রতি ঘণ্টার খরচ ৭০ হাজার পাউন্ড, অ্যাপাচে হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে ৪২ হাজার পাউন্ড, টর্নেডো যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে ৩৫ হাজার পাউন্ড, ডিসি ১০ বিমানের ক্ষেত্রে ৩৫ হাজার পাউন্ড, সেন্ট্রি বিমানের ক্ষেত্রে ৩৩ হাজার পাউন্ড, সেন্টিনেল বিমানের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার পাউন্ড।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করা যায়, কেন এত যুদ্ধ, কেন এত খরচ। আরো অনেক দেশেও তো গণতন্ত্রের সংকট রয়েছে, চলছে নিপীড়ন। অনেক জায়গাতেই আছে মানবিক সংকট। সে সব দেশে এ ধরনের কোনো হামলা করেনি ন্যাটো বা ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশ। তা হলে লিবিয়ায় কেন তা করা হলো? অথচ লিবিয়ার গাদ্দাফির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সুসম্পর্ক ছিল। সে তথ্যও ফাঁস করেছে যুক্তরাজ্যের পত্রিকা। এ ব্যাপারে তথ্যসমৃদ্ধ বইও প্রকাশিত হয়েছে। ইতালির সঙ্গে গাদ্দাফির ছিল সুসম্পর্ক। ইতালির কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অর্থ যোগান দিয়েছিলেন গাদ্দাফি। এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ইউরোপে বেআইনিভাবে মানুষ যাতে না ঢুকতে পারে সে চেষ্টা চালায় ইউরোপের দেশগুলো। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে ইতালি। আর ইতালির এ কাজে সহযোগী ছিলেন গাদ্দাফি। বেআইনিভাবে ইতালিগামী মানুষকে আটক করার কাজে ইতালির সহযোগী হয়ে ওঠেন গাদ্দাফি। লিবিয়ার ভেতরে বিরোধীদের ওপর নজরদারি করতে এবং বিরোধীদের দমন-পীড়ন চালাতে যন্ত্রপাতি দিয়ে গাদ্দাফিকে সাহায্য করেছে পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ। তাহলে আজ এসব দেশ গাদ্দাফির প্রতি অসন্তুষ্ট কেন?
ঘটনাবলী খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, লিবিয়ায় ন্যাটোর সাম্প্রতিক হামলার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। এ কারণগুলোর একটি হচ্ছে লিবিয়ার তেল, যা এ লেখার গোড়ার দিকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। লিবিয়ায় তেলের ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই আজকের এ যুদ্ধের অন্যতম কারণ।

Thursday, August 25, 2011

তেলের সঙ্গে গ্যাসও যেন উৎপাত (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-৯)

নাইজেরিয়ায় তেলের বা তেল নিয়ে নানা কর্মকান্ডের কথা এলে গ্যাসের প্রসঙ্গও আসে, যেমন কান টানলে আসে মাথা। নাইজেরিয়ার তেল সমৃদ্ধ নাইজার বদ্বীপ অঞ্চল সম্পর্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের একটি অংশে উল্লেখ করা হয় গ্যাস বেরিয়ে পড়া ও গ্যাস পুড়ে তৈরি আগুনের লেলিহান শিখার প্রসঙ্গটি। এতে বলা হয় নাইজার অঞ্চলে ভূমির ছিদ্র দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে পড়ে, এমন প্রমাণ রয়েছে। সে অঞ্চলের কোনো কোনো জলাভূমিতে বুদ্বুদ দেখা যায়; অর্থাৎ এর আবার আরেকটি অর্থ রয়েছে। সেটা হচ্ছে হাইড্রোকার্বন হয় তো পানিতে থাকা প্রাণে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, তার পরে তা বেরিয়ে আসছে বায়ুমন্ডলে। বেরিয়ে আসা ও বায়ুমন্ডলে মিশে যাওয়া হাইড্রোকার্বনের পরিমাণ অজানা।
আবার বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৫ সালের এক প্রকাশনায় অনুমান ব্যক্ত করা হয় যে, স্থানীয় বাজার ও অবকাঠামো না থাকায় নাইজেরিয়ায় ৭৫ শতাংশ গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা হয়। বিশ্বব্যাংকের এ অনুমান উল্লিখিত হয় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ওই প্রতিবেদনে। এভাবে গ্যাস পুড়িয়ে ফেলায় অক্সাইড অব কার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার অক্সাইড প্রভৃতি উপাদানও বাতাসে মিশে যায়। গ্যাস এভাবে পোড়ানোর ফলে এসিড রেইন বা অম্ল বৃষ্টিও একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ করা দরকার যে, অম্ল বৃষ্টি হলে গাছ, দালানকোঠা ও প্রাণের ক্ষতি হয়। গ্যাস এভাবে পুড়িয়ে না ফেলার জন্য তেল শিল্পের বড় বড় কোম্পানি নানান পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে। তেল আহরণে ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম ও যন্ত্রও অম্ল বৃষ্টির কারণ। গ্যাস কতটুকু, কিভাবে পোড়ানো হবে, সে ব্যাপারে নাইজেরিয়ায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সে সব আইন লঙ্ঘনের আর্থিক দন্ডও নির্ধারিত আছে। তবে সেসব আর্থিক দন্ডের পরিমাণ এত কম যে, তা আইন লঙ্ঘনে নিরুৎসাহিত করে না। গ্যাস পোড়ালে বায়ু ও তাপ দূষণ ঘটে; তা নষ্ট করে প্রাণবৈচিত্র্য। এছাড়া পুড়িয়ে ফেলা গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য। এ ক্ষতি বিপুল। গ্যাস পোড়নোর সময় শব্দ হয়। তাপ বৃদ্ধি পায়। বেড়ে চলা তাপ মেরে ফেলে উদ্ভিদ, গুল্মলতা এবং বাধাগ্রস্ত করে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে। তা ফুল-ফল ধরার ক্ষেত্রে বাধা দেয়, কৃষি ফলন কমায়। যেখানে গ্যাস পোড়ানো হয়, তার চারপাশে মানুষ, অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ দিন-রাত অবিরাম আলোর মধ্যে থাকে। অবিরাম আলো সবার জন্যই ক্ষতিকর। কেবল মানুষ ও প্রাণীরই নয় উদ্ভিদেরও কিছু সময় অাঁধার দরকার, প্রয়োজন বিশ্রাম কাল। এত আলো, এত তাপ, অবিরাম এ যাতনা পাখিদেরও ক্ষতি করে। আর মানুষেরই বেঁচে থাকার জন্য দরকার উদ্ভিদ, পাখি, নানা প্রাণী মিলে এমন এক জগত, যে জগতে আছে প্রাণবৈচিত্র্য।
মাটি দেবে যায় : তেল-গ্যাস আহরণের সঙ্গে এক শ্রেণীর অর্থনীতিতে জড়িত বণ্টনে বৈষম্য, লুট ছাড়াও এ আহরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হচ্ছে মাটি দেবে যাওয়া।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মান উন্নয়ন সংক্রান্ত এ প্রতিবেদনে বলা হয় : তেল ও গ্যাস বিপুল পরিমাণে আহরণ করলে মাটি দেবে যায়। তবে এ ব্যাপারে এখনো যা আভাস-সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা সামান্য। মাটি দেবে যাওয়ার সংশয় দেখা গেছে গুনডো অঙ্গরাজ্যের মোলুকে ও রিভারস অঙ্গরাজ্যের বনিত এবং বদ্বীপ অঞ্চলের কয়েকটি জায়গায়।
এ প্রসঙ্গে এ প্রতিবেদনে উল্লৈখ করা হয়- যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি বদ্বীপ অঞ্চলের কথা। সেখানে তেল ও গ্যাস আহরণের ফলে মাটি দেবে গেছে। মাটি দেবে গেলে ধারেকাছে নদীতীর, সাগরের বেলাভূমিতে ভাঙন বেড়ে যায়। নদীতীর-সাগরতটে ভাঙন বৃদ্ধির একটি ফলাফল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও স্রোত প্রবল হওয়া, এ ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। তবে এটাও বাস্তব যে, তেল ও গ্যাস আহরণ কাজে চলাচল ও যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়া সহজ করার জন্য খাল কাটা, সমুদ্রতট দিয়ে পাইপ বসানো, জেটি তৈরি, ইত্যাদি কাজের কারণেও তীরতট ভাঙন বেড়েছে।
এ ধরনের কাজ কারবারের ফলে যে সব ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওনডো অঙ্গরাজ্যে আউয়েতে এক তেল কোম্পানি একটি খাল কাটে। এ খাল কাটার উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির কাজ সহজ করা। অর্থাৎ চলাচল ও পরিবহন স্বচ্ছন্দ করে তোলা। কিন্তু সে খাল দিয়ে ঢুকে পড়ে নোনা পানি। তাতে ক্ষতি হয় ২০ হেক্টরেরও বেশি পরিমাণ জমির। আরেক তেল কোম্পানি ডেল্টা অঙ্গরাজ্যে তাদের স্থাপনা থেকে উপকূল পর্যন্ত পাইপ বসায়। আর সে কাজের ফল দাঁড়ায় প্রতিবেশ নষ্ট, নোনা পনির প্রবেশ, তট ভাঙন।
প্রাণ কি বাঁচে এভাবে, মানুষের জীবন ধারণ কি সহজ হয় এভাবে? না কি জীবন ধারণ হয়ে পড়ে কষ্টকর? এ সব প্রশ্ন ভেবে দেখা দরকার নয় কি? এসব কান্ড দেখে যদি কারো মনে হয় যে, গ্যাস বোধ হয় উৎপাত, তা হলে ভুল হবে কি?
বন ধ্বংস : তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য অনেক সময়ই বনের ভেতরে ঢুকতে হয়। কারণ হয় তো সেখানে মাটির নিচে রয়েছে তেল খনি বা গ্যাস ক্ষেত্র। বনে ঢোকার জন্য পথ তৈরি করতে হয়। তখন সে পথ গাছ চোরদের চলাচল সহজ করে দেয়। বেড়ে যায় গাছ চুরি, ধ্বংস হয় বন। এছাড়াও তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং আহরণের কাজে বন ধ্বংস হয়। বন অঞ্চলে এসব কাজ করার জন্য তৈরি করতে হয় নানান ধরনের স্থাপনা, পাততে হয় পাইপ, বসাতে হয় নানা যন্ত্রপাতি। এতে ধ্বংস হয় বনের সঙ্গে প্রাণবৈচিত্র্য।
প্রাণবৈচিত্র্য ছাড়া বনের কথা কল্পনা করা যায় কি? গাছপালা, লতাগুল্ম, শ্যাওলা, ছত্রাক- এসবের ওপর নির্ভর করে থাকা নানা প্রাণী যেমন জীবজন্তু, পাখি, কীট, পতঙ্গ, ছাড়া কল্পনা করা যায় কি বন? সে বন ধ্বংস হলে? নাইজেরিয়ায় তেলসমৃদ্ধ এলাকায় এমন ধ্বংসের ঘটনাই ঘটেছে। আর বন যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা স্পষ্ট করার জন্য সামান্য কিছু তথ্য উল্লেখ করা যায়। জন বেলামি ফস্টার দ্য ভালনারেবল প্লানেট একটি ইকোনমিক হিস্টরি অব দ্য এনভায়রনমেন্ট (বিপন্ন পৃথিবী, পরিবেশের সংক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক ইতিহাস নামে ঢাকায় সাহিত্য প্রকাশ বইটি প্রকাশ করেছে) বইতে লিখেছেন অনুমান করা হয়, বর্তমান বিশ্বে তিন কোটি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে যৎসামান্য ১৪ লাখ প্রজাতিকে চিহ্নিত এবং এ সবের তথ্য তালিকাভুক্ত করা গেছে। একটি প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ… প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের ধারা বিষয়ক তথ্য সম্ভার হারিয়ে যাওয়া। আর এসব তথ্য নতুন খাদ্য, ক্যান্সার মোকাবিলার নতুন ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রীর সন্ধান দিতে পারে। মানব জাতি বর্তমানে তার খাদ্য সরবরাহের ৮০ শতাংশের জন্য মাত্র ২০টি প্রজাতির ওপর নির্ভর করে। অথচ এখনো খাবার যোগ্য প্রায় ৭৫ হাজার প্রজাতির গাছপালা রয়েছে বলে জানা যায়। এসবের পুষ্টিমানও বিপুল…। মাত্র কয়েক বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্যাসিফিক ইউ গাছকে মনে করা হতো যে, এগুলো ‘আগাছা’। যারা বন কাটতো, তারা এ গাছ পুড়িয়ে ফেলত, আজ জানা গেছে, এ গাছ হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদানের উৎস। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত যত ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া ঘটে জনসাধারণের জীবনে। পরিবেশ নষ্ট হলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমাজের নিচের দিকে থাকা মানুষের বঞ্চনা বেড়ে চলে।
নাইজেরিয়ায় অধিকাংশ তেল স্থাপনায় বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে তেল শিল্পের তৈরি বর্জ্য পড়ে মাটিতে, জলে, বনে, সাগরে, জলায়। এর পরিণতি ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবেশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো বিধিবিধান না মেনে ৩০ বছরের বেশি কাজ চালিয়েছে তেল কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে শেল। পরিবেশ রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাটি গঠন করা হয় ১৯৮৮ সালে। তবে বিভিন্ন ধরনের নিঃসরণ ও আবর্জনা ফেলার ক্ষেত্রে মান এবং বড় ধরনের সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ নিরূপণের প্রয়োজন সংক্রান্ত আইন নববইয়ের দশকের গোড়ার আগে পর্যন্ত প্রণীত হয়নি। কিন্তু ততদিনে নাইজার বদ্বীপ অঞ্চলের ক্ষতি হয়ে গেছে বিপুল। এমনকি, তেল কোম্পানিগুলোর কাজ-কারবার ঠিক মতো দেখাশোনার সামর্থ্য সে দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আছে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর চেয়ে তেল কোম্পানিগুলোর সামর্থ্য ও সুবিধা বেশি। কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে ভালো মানের ও হালনাগাদ তথ্য সংবলিত মানচিত্র, উপগ্রহের মাধ্যমে তোলা ছবি, দূর ধাবন প্রযুক্তি, উন্নত কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাবলী। পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের, বিশ্লেষণের ও উপস্থাপনের জন্য উন্নত কম্পিউটার ইত্যাদি দরকার হয়।
এ প্রতিবেদনেই বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সরঞ্জাম যন্ত্রপাতি এত অপ্রতুল, এত সেকেলে যে, স্থানীয় জনসাধারণের চোখেই তা ধরা পড়ে। তারা দেখেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর (বক) সুউন্নত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি, কর্মকৌশল। তারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন বকদের দেখে; তারা মনে করেন না যে, সরকারি সংস্থাগুলো জনসাধারণকে রক্ষা করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এ পর্যন্ত প্রণীত নানান আইন, বিধিবিধানে কারাদন্ড, অর্থদন্ডসহ নানান দন্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ, তারা এসব আইন বলবত হতে দেখেননি।
আবার দেখা গেছে, অর্থ দন্ডের যে পরিমাণের কথা আইনে উল্লেখিত হয়েছে, সে পরিমাণ অর্থদন্ড মুদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় ন্যায়পর নয়। আর নাইজেরিয়াকে মুদ্রাস্ফীতিপ্রবণ দেশ বললে ভুল বলা হবে না। এ মন্তব্যও ওই প্রতিবেদনের। এতে বেশ কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, পরিবেশ সংক্রান্ত ক্ষতির ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে যা পেয়েছে সেটা যৎসামান্য। পরিবেশ ক্ষতি বিষয়ে মামলা চলে দীর্ঘসময় ধরে- এমন উদাহরণ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালত ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ প্রদানের আদেশ দেয়, সেটা ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি করা অর্থের পরিমাণের চেয়ে কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার রায় যায় তেল কোম্পানির পক্ষে। এর কারণ হিসেবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ তেল দূষণের ফলে দায়ের মাত্রা ও ক্ষতি নিরূপণের ব্যবস্থা না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ : নাইজেরিয়ায় তেল কোম্পানিগুলোর রয়েছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অনেক ঘটনা। এমনকি প্রতিশ্রুতি কার্যকরভাবে পালিত না হওয়ার উদাহরণও অনেক। এক গ্রামের নাম ফিশ টাউন- মাছ শহর। গ্রামে কেবল কাঁচা ঘর, বসত গ্রামবাসীদের। শেভরণ টেক্সাকো বলেছিল, গ্রামে স্কুলের জন্য দালান, গ্রামবাসীদের সভা-সমিতি করার জন্য একটি হল, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানির কূপের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তৈরি করে দেওয়া হয়েছে কেবল একটি জেটি, নৌকাঘাটা। শ্বেতহস্তি প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে যেমন ঘটে, সে নৌকাঘাটার ক্ষেত্রেও হলো তাই। তা হয়ে পড়ে অকেজো। কয়েক বছরের মধ্যে ভাঙন নৌকাঘাটাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে মূল ভূমি থেকে। এ গ্রামেরই কাছে আরেক গ্রাম, নাম তার সানগানা। শেভরন টেক্সাকো ও কোম্পানিটির শরিকরা সেখানে ২০০১ সালে হাসপাতাল তৈরি করে দেয়। কিন্তু সেখানে নেই কোনো ডাক্তার, নেই কোনো ওষুধ। এ তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে।
এ যেন প্রতিশ্রুতির খেলা। আর খেলা সাধারণ মানুষকে নিয়ে। এ খেলা কেবল নাইজেরিয়ায়, তা নয়। এ খেলা চলে প্রায় সব দেশে।
নানা দেশ থেকে তেলসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদ লুট আর বিনিময়ে চাপিয়ে দেওয়া দারিদ্রে্যর দুর্ভোগের বিবরণ শেষ হওয়ার নয়। এ বিবরণের রয়েছে নানা দিক। এর সঙ্গে জড়িত অনেক পক্ষ, অনেক কর্মকৌশল। কেবল চুক্তির বিবরণ আর তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা লুটের প্রতারণার পন্থাগুলোর বিবরণই দীর্ঘ। এখন সে সবে না গিয়ে অন্যান্য দেশে তেল-গ্যাস-প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। আগামীতে থাকবে এমন আরেক দেশের কথা।

Thursday, July 28, 2011

তেলের আগুনে পুড়ছে নাইজেরিয়ার মানুষ (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশ-৫)

যে দেশটির তেল নিয়ে রাজনীতির এত জটিল খেলা তেল কোম্পানি আর অন্যান্য দেশের, সেই নাইজেরিয়ার অবস্থা কেমন? এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য দেখা যেতে পারে বিশ্ব শান্তি সূচকে নাইজেরিয়ার অবস্থান কোথায়? এ সূচক অনুযায়ী ২০১১ সালে নাইজেরিয়ার অবস্থান ছিল ১৪২তম। ইন্সটিটিউট অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস ১৫৩টি দেশের অবস্থান নির্ণয় করে এ সূচকের সাহায্যে। মোট ২৩টি গুণগত ও সংখ্যাগত সূচক দিয়ে ১৫৩টি দেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয় প্রতি বছর। সমাজে সহিংসতা আছে নাকি নেই, সেটা যাচাই করার কাজে ব্যবহৃত হয় এ সূচক, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা জিপিআই। এ অবস্থান নির্ণয়ে বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে থাকে একটি রাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়, রাষ্ট্রটি মানবাধিকার কতটা মেনে চলে ইত্যাদি। জিপিআই অনুসারে নাইজেরিয়ার অবস্থান হয় জিম্বাবুয়ে ও শাদের পরে।

এরই পাশাপাশি দেখা যেতে পারে গণতন্ত্র সূচকে নাইজেরিয়ার অবস্থান। এ সূচক অনুসারে ২০১০ সালে নাইজেরিয়ার অবস্থান ছিল ১২৩তম। ব্রিটেনের ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট ২০০৬ সাল থেকে এ সূচক ব্যবহার করে ১৬৬টি দেশে গণতন্ত্রের অবস্থা পরিমাপ করে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন, ভোটারদের নিরাপত্তা, বিদেশী শক্তি বা সরকারের প্রভাব, রাষ্ট্রের নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়। ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্স বা গণতন্ত্র সূচক ২০১০ প্রকাশ করা হয় চলতি বছরের ২৬ মে। এর আগের গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এবার দেখা যাক এ দেশটিতে সংঘাতের ‘ছবি’টি কেমন? একেবারে সংক্ষেপে তা হচ্ছে :

১. তিন বছরে তেল সংশ্লিষ্ট বা তেল সৃষ্ট সংঘাতে সেখানে নিহতের সংখ্যা ৫৩ হাজার। অর্থাৎ তেল সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বছরে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। অর্থাৎ মাসে প্রায় দেড় হাজার মানুষ। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৫০ জন মানুষ। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দু’জন মানুষ মারা যান বা মারা হয় সে দেশে। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। বাস্ত্তচ্যুত হয়েছেন হাজার হাজার নারী-শিশু-বৃদ্ধ-অসুস্থ মানুষ।

২. কোনো কোনো পরিসংখ্যান বলে, সে দেশের ৭০ ভাগ মানুষকে দারিদ্র্যরেখার নিচে জীবনযাপন করতে বাধ্য করছে ব্যবস্থাটি। আবার কোনো কোনো পরিসংখ্যান বলে এ হার প্রায় ৩৭ ভাগ। জাতিসংঘের দারিদ্র্য সূচকের হিসাব অনুসারে এ দেশটির অবস্থান সবচেয়ে গরিব দেশ হিসেবে কোনো কোনো বছরে দাঁড়ায় ২৫তম।

৩. মরণরোগ এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের হিসাবের দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা আর ভারতের পরে নাইজেরিয়ার স্থান। এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২০০৫ সালে ছিল ২৯ লাখ। এদের মধ্যে ৫৫ ভাগ ছিলেন নারী। এইডস এতিম বলা যায় যে শিশুদের তাদের সংখ্যা সে সময় ছিল প্রায় ১০ লাখ।

৪. ইউনিসেফের হিসাব অনুসারে পৃথিবীতে অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে সাড়ে ১৪ কোটি। এদের মধ্যে কেবল নাইজেরিয়াতেই রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ।

ওপরের এসব তথ্য নেওয়া হয়েছে রবি ভবানীর ২০০৮ সালে লেখা রিসোর্স স্কার্স সিটি অ্যান্ড এবানড্যান্স : অয়েল, ডেমোক্র্যাটাইজেশন অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ইন দ্য নাইজার ডেল্টা দ্য হিউম্যান ফেস অব রিসোর্স কনফ্লিক্ট ইউনিসেফ ও বিবিসিসহ বিভিন্ন নিবন্ধ/সংবাদ মাধ্যম/আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশনা/খবর থেকে।

এ অবস্থা যে দেশটির, সে দেশ আফ্রিকার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদক ও রফতানিকারক। দেশটির রাজস্বের প্রায় ৪০ ভাগ আসে তেল থেকে। ফলে দেশের গোটা অর্থনীতি হয়ে পড়েছে তেলনির্ভর। এর পরিণতিতে অর্থনীতি যে রোগে আক্রান্ত হয়, তার নাম ডাচ ডিজিজ বা ওলন্দাজ রোগ। এ রোগে এক পাশে কাৎ হয়ে পড়ে অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতির অন্যান্য অংশ হয়ে পড়ে বলহীন, যায় শুকিয়ে, কেবল তেলসিক্ত অশংটুকু হতে থাকে স্ফীত, তেল চকচকে। একে কেন্দ্র করে দেখা দেয় টানাটানি, উত্তেজনা। চালাক-চতুর ধুরন্ধর লোকেরা, ওপর মহলে হাত আছে এমন ফন্দিবাজরা বা মহাজনরা হাতিয়ে নিতে থাকে সব। তাদের চলাচল, বেশভূষা, গাড়ি-বাড়ি, শানশওকত, খাওয়া-দাওয়া, হাবভাব-ভঙ্গি, আচরণ, কথাবার্তায় যা প্রকাশ পায় তা উদ্ধত্য, বলদর্পী। সবাইকে পদানত করে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ধারাই প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজে। রাজনীতি সমাজের, অর্থনীতির অংশ হওয়ায় ওলন্দাজ রোগের অপচ্ছায়া পড়ে রাজনীতিতে। সাধারণ যারা, যারা গরিব, কম আয় করা মানুষ হয়ে পড়েন কোণঠাসা। তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনী তোলে না রাজনীতিতে, সমাজে। মিথ্যাচার আর ভন্ডামির পাশাপাশি বেড়ে চলে বঞ্চনা, বৈষম্য, ধনী-গরিব বিভেদ। তৈরি হয় সংঘাতের পটভূমি।

এ অবস্থা অন্যান্য দেশেও দেখা গিয়েছিল/গেছে। সব ক্ষেত্রে তেলের পয়সার রোগ নয়। কোথাও তা হয় বিদেশী সাহায্য লুট করে নেওয়া পয়সায়। আবার কোথাও কাপড় সেলাই করা পয়সা, কোথাও মানুষ রফতানি করা পয়সা, কোথাও ব্যাংক ও অন্যান্য বাজার থেকে লুটে নেওয়া জনসাধারণের পয়সায়।

নাইজেরিয়ায় দেখা গেল তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে তেল কোম্পানিগুলো। এরা বিদেশী। দেশের মানুষ সবসময়ই দেখতে পাচ্ছেন তেল থেকে যে পয়সা আসে, তা তাদের ভাগ্যে জোটে না, সে তেল তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরায় না, তৈরি হয় ক্ষোভ, অসন্তোষ, ক্রোধ, তা অনেক ক্ষেত্রে চরমে রূপ নেয়। প্রাণ ধারনের শেষ উপায় হিসেবে কেউ কেউ তেল চুরি করেন, কেউ করেন অপহরণ, ক্রোধ প্রকাশে কেউ চালান অন্তর্ঘাত। সেই সঙ্গে থাকে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা, যে প্রতিযোগিতা কোম্পানিগুলো আইনগত কাঠামোর মধ্যে নিষ্পত্তি করতে পারে না; আর তা পারে না বলেই এসব কোম্পানি তখন গড়ে তোলে/উস্কে দেয়/মদদ দেয় সশস্ত্র সংগঠন/সংগঠনগুলোক। একদিকে, অব্যবস্থাপনা-লুট-দুর্নীতি-পুকুর চুরি, আরেকদিকে দারিদ্র্য-ক্ষোভ, ছিচকে চুরি বাড়িয়ে তোলে সংঘাত। এ যেন খনি থেকে তেল তোলার সময় উপজাত হিসেবে বেরিয়ে আসা বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া আগুনের বিশাল শিখা। নাইজেরিয়ার নাইজার বদ্বীপে এমন শিখা, আক্ষরিক অর্থেই, অনেক জ্বলতে দেখা যায়।

এমনি এক শিখা জ্বলছিল সত্তরের দশক থেকে ইতালীয় তেল কোম্পানি এগিপের মালিকানাধীন তেলকূপের মাথায়। দিন-রাত পোড়ে গ্যাস, মাঝে-মধ্যে তেল ছিটকে পড়ে পাশের গ্রাম আকারাউলুতে, আর সে কূপের নাম অশি। সেই অশির শিখায় পুড়ে যায় আকারাউলুর কিশোর ভাগোগো জোয়েলের বাহু। জোয়েল তখন বাবার সঙ্গে মাছ ধরছিল। সে গ্রামের ১৭শ’ পরিবারকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, অর্থনৈতিক কল্যাণ আসবে তাদের জীবনে, এ তেলের বিনিময়ে। এ তথ্য দিয়েছে নাইজেরিয়ার তেল সংক্রান্ত একটি কেস স্টাডি।

এ অবস্থা যে ছবি ফুটিয়ে তোলে, তা হচ্ছে শোষণের, লুটের, আর এসবের সাথী সংঘাত, দারিদ্র্য, বৈষম্যের। তাই, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির নাইজার ডেল্টা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট বা নাইজার বদ্বীপ মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে ২০০৬ সালে বলা হয় : চারপাশে প্রাচুর্য। আর তারই মধ্যে স্থানীয় অধিবাসীরা ভুগছেন দারিদ্রে্য, দুর্দশায়। এ কারণেই সেদেশে অনেকে তেল ও গ্যাসকে অভিশাপ হিসেবে গণ্য করেন, তেল গ্যাসকে মনে করেন দুধারী তলোয়ার।

এতে বলা হয়, তেলের দাম যখন বাড়তে বাড়তে সবকিছু ফাটিয়ে দিচ্ছে, তখনো নাইজেরিয়ায় মানুষের আয়ু কমছে। যে অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ যোগায়, সে অঞ্চলটির মানুষের ইন্ধন প্রাপ্যতা শোচনীয়। এ বদ্বীপ অঞ্চল প্রতি দিন ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি অশোধিত তেল উৎপাদন করলেও এ অঞ্চলেই জ্বালানি আমদানি করতে হয়। যে অঞ্চলটি নাইজেরিয়ার অন্যান্য স্থানে বিশাল সব অবকাঠামো উন্নয়নে আর আফ্রিকার অন্যান্য স্থানে ব্যয়বহুল শান্তিরক্ষা কাজে অর্থ যোগায়, সে অঞ্চলটিতে সড়ক নেই বললেই চলে। অথচ এ বদ্বীপ অঞ্চলই নাইজেরিয়ার বিদেশী মুদ্রা আয়ের ৮০ ভাগ ও সরকারি রাজস্বের প্রায় ৭০ ভাগ যোগায়।

এ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নাইজার বদ্বীপ অঞ্চলে পানি সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগসহ অবকাঠামো ও সামাজিকসেবা পাওয়া যায় না; যতটুকু আছে, তার মান খারাপ।

এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য সে অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে আলাপকালে একজন বলেন, এখানে জলের কলে পানি ছিল এক সময়ে। সেটা ২০ বছর আগে, আমরা এখন মূলত নদীর পানি পান করি।

এ অঞ্চলের বাসিন্দারা পানি সংগ্রহ করে নদী, হ্রদ, পুকুর থেকে। মাটির গভীরে নল বসিয়ে জল তোলা হলে, তা কিনতে হয়। বেকারত্বও ব্যাপক। অথচ এ বদ্বীপ অঞ্চলটিই প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির কাছে আকর্ষণীয়। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে শেল, শেভরন, মবিল, এল্ফ, এগিপ, টেক্সাকো। আরো কোম্পানি রয়েছে। পল্লী অঞ্চলের অনেক মানুষের কাছেই পরিবহন ও যোগাযোগ দুর্ভোগের উৎস হিসেবে গণ্য। মোটরসাইকেলে যাতায়াতের খরচ চড়া। তাই তাদের অনেকে হেঁটে পাড়ি দেন দীর্ঘপথ।

এমন বিবরণী জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির উপরোক্ত প্রতিবেদনে রয়েছে। আর এমন বিবরণ সে দেশে অনেক। তাই, তেল-গ্যাস আহরণ হলেই তা দূর করবে দারিদ্র্য, এ কথা যে সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়, নাইজেরিয়া তার প্রমাণ।

Thursday, July 7, 2011

তেল-গ্যাস লুন্ঠন দেশে দেশে-২ : আফ্রিকার অভিজ্ঞতা

সম্পদ, প্রাচুর্য আর দারিদ্র্য, লুট আর দুর্দশা, কতিপয়ের বিলাস আর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মানবেতর জীবনের কথা উঠলেই আফ্রিকার প্রসঙ্গ ওঠে। ‘বিচিত্র’ এক মহাদেশ!
নক্রুমা আগের সংখ্যায় উল্লেখিত বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই লিখেছেন : আফ্রিকা আপাতদৃশ্য এক বৈপরীত্য। তার মৃত্তিকা প্রাচুর্যে ভরা। অথচ সে মাটির ওপর আর নিচ থেকে যে সামগ্রী আসে, সেগুলো আফ্রিকানদের সমৃদ্ধ করে না। সে সামগ্রী সম্ভার ধনী বানায় তাদেরই যারা আফ্রিকাকে গরিব বানানোর জন্য কাজ করে চলে। আফ্রিকার খনিতে যে লোহা আকর মজুদ আছে তা আমেরিকার মজুদের দ্বিগুণ, (তৎকালীন) সোভিয়েত ইউনিয়নের দুই-তৃতীয়াংশ। আফ্রিকার খনিতে যে কয়লা মজুদ আছে তা দিয়ে তিনশ’ বছর চলা যায়। তেলের নতুন নতুন খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশ্বের সম্ভাব্য জলশক্তির শতকরা ৪০ ভাগ রয়েছে আফ্রিকায়। অন্য কোনো মহাদেশে এতো পানি শক্তি নেই। সাহারা মরুভূমির বিস্তৃতি সত্ত্বেও আফ্রিকায় আবাদযোগ্য ও চারণ ভূমি যা আছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে বেশি। বেশি এশিয়ার চেয়ে। আফ্রিকার বনভূমি যুক্তরাষ্ট্রের বনভূমির দ্বিগুণ। এমন মহাদেশ সম্পর্কে যে কাউকে প্রশ্ন করলে আফ্রিকার পরিচয়ের সঙ্গে উঠে আসবে দারিদ্র্য, সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, লুটের কথা। অথচ এ মহাদেশটি মানব জাতির সূতিকাগার। এখানে প্রায় ৭০ লাখ বছর আগে প্রাণী আর পূর্ব মানবের বিবর্তন রেখা দুটির মিলন ঘটেছিল। এখানেই সর্বপ্রথম মানুষের পূর্ব পুরুষরা বসতি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে তাদের যাত্রা হয় ইউরোপে, এশিয়ায়।
দফায় দফায় সে যাত্রার পরে মহাদেশটিকে করায়ত্ত করে বেলজিয়াম, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন। পৃথিবীর ভূভাগের শতকরা ২০ ভাগ নিয়ে গঠিত এ মহাদেশে বসবাস বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। আর ২০০৫ সালে মহাদেশটিতে উদ্বাস্ত্তর সংখ্যা ছিল দেড় কোটি। এদের মধ্যে ৩৩ লাখ মানুষ সংঘাত, সহিংসতা, রক্তপাতের হাত এড়াতে নিজ বাসভূমি থেকে পালিয়েছেন অন্য দেশে। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজ দেশেই আছেন। তবে নিজ বসতের এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায়। সারা পৃথিবীতে যে ৩৮টি দেশকে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বিপুলভাবে ঋণগ্রস্ত গরিব দেশ হিসেবে গণ্য করে, সেগুলোর মধ্যে ৩২টি রয়েছে এ মহাদেশে। এ সব তথ্য দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাময়িকীর ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায়। ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন তার রিপোর্টে আফ্রিকা সম্পর্কে বলেছিল : মহাদেশটি চক্কর খেতে খেতে নিচে নামছে। সেখানে আছে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, হ্রাসমান সঞ্চয়, নতুন বিনিয়োগে অবহেলা, শিক্ষার অভাব, শিশু মৃত্যুর চড়া হার, গ্রামে অনাহার থেকে পালাতে শহরে এসে ভিড় জমানো। এসব বাড়িয়ে তোলে অপর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের সমস্যা।
আফ্রিকার এই সংকটের বহু কারণ। এ সবের একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, আফ্রিকার অনেক দেশের কাঁচামালের দাম পড়ে গেছে। বাণিজ্যের শর্ত হয়েছে প্রতিকূল, সাহায্যের তহবিল গেছে কমে। আফ্রিকায় কৃষি উৎপাদন সাম্প্রতিককালে এতো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, সেটা কোনো আক্রমণকারী সেনাবাহিনীর পোড়া মাটি নীতি অনুসরণ করলে যে ক্ষতি হতো তার চেয়েও বেশি। অথচ আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের সরকার মাটির সে ক্ষতি রোধে যে অর্থ খরচ করে, সম্ভাব্য আক্রমণকারী সেনাদলের হাত থেকে রক্ষা পেতে খরচ করে তার চেয়ে বেশি।
কেন এমন অবস্থা এ মহাদেশের? এ প্রশ্নেরও উত্তর দেন নত্রুুমা : আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ মহাদেশটির শিল্পোন্নয়নে নিয়োজিত হয়নি। তা ব্যবহৃত হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ার শ্রী বৃদ্ধিতে। এ এক বিরামহীন প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা প্রবলভাবে বেড়েছে। সমর প্রস্ত্ততি আর পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। কারণ হিসেবে তিনি পাকা মালের বর্ধমান চাহিদা মেটাতে ধাতব ও অ-ধাতব কাঁচা মাল আহরণে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এ সব প্রযুক্তি কাঁচা মাল আহরণের কাজ দ্রুত করতে পারে।
মোদ্দা কথায় ব্যাপারটি দাঁড়াচ্ছে : আরো মুনাফার জন্য আরো পণ্য তৈরি, আরো পণ্য তৈরির জন্য আরো কাঁচা মাল আহরণ, আরো কাঁচা মাল আহরণের জন্য খুবলে নাও, কেড়ে নাও, ছিনিয়ে নাও, দখল কর যা কিছু আছে আফ্রিকার। আর কাঁচা মালের ক্ষেত্র ও পাকা মালের বাজার দখলে রাখতে বানাও অস্ত্র। সেই সঙ্গে কোনো কোনো দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে পড়েছে সমর শিল্পনির্ভর।
এ ধারাই আফ্রিকাকে আবৃত করে দেয় নিরক্ষরতা, অনাহার, দুর্নীতি, অপশাসন, বঞ্চনা, নির্যাতনের কালো চাদরে। সেখানে চাপিয়ে দেওয়া হয় যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ-অস্ত্র কেনা আর সেনাদল পোষার বিপুল ব্যয়।
অথচ ব্রিটেনের শ্রমিক দলীয় নেতা ও এককালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন ১৯৫৩ সালে দ্য ওয়্যার অন ওয়ার্ল্ড পভার্টি এন এপিল দ্য কনশেন্স অব অ্যানকাউন্ড বইতে লিখেছিলেন : মানবজাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা যুদ্ধ নয়, নয় কমিউনিজম বা জীবন ধারণ ব্যয় বা কর। তাহচ্ছে ক্ষুধা, এ ক্ষুধা একই সঙ্গে দারিদ্র্য, দুর্দশার কারণ ও ফলাফল।
আফ্রিকার এ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, দুর্দশার সঙ্গে যুক্ত মহাদেশটির সম্পদ অন্যত্র চলে যাওয়া, শিল্পে ব্যবহার্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ৫৩টি খনিজ সম্পদ ও ধাতব পদার্থ রয়েছে আফ্রিকায়। অথচ আফ্রিকায় শিল্পোন্নয়ন হয়নি। এগুলো চলে যায় বহুজাতিক কোম্পানির (বক) হাত ধরে অন্য দেশে, প্রভুদের পকেটে। সব বহুজাতিক কোম্পানি (বক) বিনিময়ে দিয়েছে হানাহানি, অস্ত্র, যুদ্ধ, বিবাদ।
আফ্রিকাকে কব্জা করতে ঔপনিবেশিক প্রভুরা তৈরি করেছে খন্ড খন্ড সত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। তাদের ঘরে গেছে মুনাফা। এ কাজে যুক্ত নানা নাম : শেল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো, ইম্পেরিয়াল টোবাকো, বর্মা অয়েল, নচাংগা কপার, রোকানা করপোরেশন, রোডেশিয়ান মাইন্স, ব্রিটিশ সাদ আফ্রিকা। এসব একচেটিয়া কোম্পানির নামে ও সংগঠনে সময়ান্তরে পরিবর্তন ঘটেছে। বেশ কিছু নাম এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুরনো নাম বদলে হয়েছে নতুন নাম। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের কাজ অব্যাহত রয়েছে। কেবল ব্রিটিশ একচেটিয়া কোম্পানি নয়, ফরাসি, জার্মান, বেলজিয়াম, ইতালীয় একচেটিয়া কোম্পানিগুলোও ছিল। এদের মধ্যে ছিল খনি কোম্পানি, পরিবহন কোম্পানি, ব্যাংক, বিনিয়োগ কোম্পানি, সব মিলিয়ে এক অাঁতাত। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পায় ১১ কোটি ডলার থেকে ৭৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। এর অধিকাংশই আসে মুনাফা থেকে। যে ৬৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার বৃদ্ধি পায় তার মাত্র ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার প্রকৃতপক্ষে নতুন বিনিয়োগ। উদ্বৃত্ত আবার বিনিয়োগসহ মোট বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পায় যুক্তরাষ্ট্র, আর আফ্রিকার দেশগুলোর লোকসান হয় ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া কোম্পানিগুলো ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেই মুনাফা করে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ হিসাবের ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান। তবে অন্যান্য সূত্রের হিসাবে মুনাফার পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার। এখানে উল্লেখিত ডলারের মূল্যমান তৎকালীন। এসব তথ্য প্রদান করে নত্রুুমা মন্তব্য করেছেন : এসব সংখ্যা দিয়ে এ কথা বুঝতে গণিতবিদ হওয়ার দরকার পড়ে না যে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ থেকে মুনাফা প্রায় শত ভাগ।
এভাবে পুঁজি, বিনিয়োগ, মুনাফা, অাঁতাত, কোম্পানি, একচেটিয়া বাজার, ইত্যাদির ‘কাহিনী’ আফ্রিকাজুড়ে, প্রায় ৫০০ বছর আগে পর্তুগিজ উপনিবেশিক শক্তির আফ্রিকায় পা দেওয়ার সময় থেকে। আজ সে ‘গল্প’ আরো মার্জিত, পরিশীলিত, সূক্ষ্ম, ‘শিল্প’ সম্মত। আজ সে ‘গল্পে’ মূল চরিত্ররা বহুজাতিক কোম্পানি (বক), তাদের পেটোয়ারা এবং তাদের বশংবদ সরকারগুলো।
সবাই মিলে খুঁজে বেড়িয়েছে আফ্রিকার সম্পদ আর সে সম্পদ লুটের কৌশল। যেমন ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে জানানো হয়, ‘‘মার্শাল প্ল্যান সংশ্লিষ্ট মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এটলাস পর্বতমালা থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত চষে বেড়াচ্ছেন আফ্রিকায় কৃষিজ ও খনিজসম্পদরাজির খোঁজে।’’ পাওয়া গেল ফরাসি-উত্তর আমেরিকায় (অর্থাৎ সেখানে ফরাসি উপনিবেশ) সীসা খনি, ফরাসি-ক্যামেরুনে টিন খনি, ফরাসি-কঙ্গোতে দস্তা ও সীসা খনি, এমন প্রাপ্তি চলেছে, চলছে।
দেখা যাবে লোহা, বক্সাইট, হীরা, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফেট, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, ইউরেনিয়াম, সোনা, মোনোজাইট, জিরকন, ক্রোমিয়াম, দস্তা, সীসা, তেল ও গ্যাস আহরণ আফ্রিকার নানা দেশে বেড়েছে অকল্পনীয় হারে। সাহারা মরুভূমিতে লোহা, তেল ও গ্যাস রয়েছে। সেখানে রয়েছে মুনাফার নজর।
আফ্রিকায় তেল ও গ্যাসের সন্ধান বকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে থাকে অনেক আগে থেকেই। লগ্নি আর শিল্প স্বার্থগুলোর মধ্যে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। সেখানে অনেক আগেই জড়িয়ে পড়ে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল, মবিল-সকোনি, গালফ অয়েল, কন্টিনেন্টাল অয়েল, ডাচ শেল, টেক্সাকো, হ্যানোবার ব্যাংক, টেনেসি করপোরেশন, টেনেসি ওভারসিজ করপোরেশন। আজ ব্যবসায়িক লেনদেন ও কলাকৌশলে এ সব কোম্পানির গঠন, নাম, ইত্যাদিতে পরিবর্তন ঘটেছে, এসেছে নতুন নাম।
তবে তেল ও গ্যাস দখলের প্রতিযোগিতা রয়ে গেছে। রয়েছে আগ্রাসন, যুদ্ধ, দখল। সেই সঙ্গে আছে অর্থনৈতিক ছলাকলা, যুক্তরাষ্ট্রের এককালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস বলেছিলেন : একটি বিদেশী জাতিকে জয় করার দুটো পথ আছে। একটি হচ্ছে অস্ত্রবলে দেশটির জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অপরটি হচ্ছে আর্থিক পন্থায় দেশটির অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম।
আজও এ ‘খেলা’ বা ‘যুদ্ধ’ চলছে। তাই আফ্রিকার নানা দেশে এর চিহ্ন বা তান্ডব দেখা যায়। আফ্রিকার যে দেশগুলোতে সংঘাত, সহিংসতা, গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা, বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপ দেখা গেছে বা যাচ্ছে এবং দেখা যাবে, সে দেশগুলোতে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজসম্পদ, তেল, গ্যাস এবং এসব সম্পদ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কয়েকটি দেশের ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি দিলে তা স্পষ্ট হবে। আগামীতে এমন কয়েকটি দেশের ঘটনার দিকে চোখ ফেরানো যাবে।