Showing posts with label বহুজাতিক কোম্পানীর যুদ্ধ. Show all posts
Showing posts with label বহুজাতিক কোম্পানীর যুদ্ধ. Show all posts

Thursday, November 3, 2011

কেবলই দুর্ভোগ কান্না-রক্ত (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৮)

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের খনিজ সম্পদের প্রসঙ্গ উঠলেই দেশটির হীরা, সোনা আর কোলটানের কথা ওঠে। দেশটির ইন্ধন সম্পদও কম নয়। এ সম্পদ এখন ক্রমান্বয়ে আগ্রহীদের চোখে পড়ছে। দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস ও কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুদ। এছাড়া পানি বিদ্যুৎ তৈরির সম্ভাবনাও বিপুল। প্রায় এক লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে দেশটিতে। এ পরিমাণ হচ্ছে বিশ্বে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের প্রায় ১৩ শতাংশ। এসবই দেশটির প্রতি আকৃষ্ট করছে মুনাফা সন্ধানকারীদের।

আফ্রিকার দক্ষিণ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অশোধিত তেলের মজুদ এঙ্গোলার পরেই; অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানীয়। দেশটির অশোধিত তেলের মজুদ ২০০৯ সালের হিসাব অনুসারে ছিল ১৮ কোটি ব্যারেল। তেল ও গ্যাস বিষয়ে দেশটি প্রথমবারের মতো সম্মেলন আয়োজন করে ২০০৮ সালের মধ্য আগস্টে। এ খবর জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার।

দেশটিতে তেল খোঁজার কাজ শুরু হয় গত শতকের ষাটের দশকে। সেখানে উপকূলের কাছে সাগরে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। ভূ-ভাগে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। এ তোলার কাজ ১৯৮৬ সালে চলছিল আটটি তেল ক্ষেত্র থেকে। এরপর থেকে তেল আহরণের কাজ বেড়ে চলে। এ ঘটনা ধারার সঙ্গে দেশটিতে হানাহানি-সংঘাত-যুদ্ধের এবং এসব হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির জ্বালানি জরিপ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় : কঙ্গোতে তেলের প্রমাণিত মজুদ বিপুল। গ্যাসও তেমন আছে। তেলের ওপর ভিত্তি করেই দেশটির সবল অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। স্থলভাগে তেল-গ্যাস যা আছে, তাতে হাতের ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে। উপকূলের কাছে তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল তুলছে ফ্রান্সের পেরেনকো, জাপানের টেইকোকু, যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন টেক্সাকো। স্থলভাগে, উপকূল অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গা তেল তুলছে পেরেনকো এবং কঙ্গোর তেল কোম্পানির কোহাইড্রো। আরো ছয়টি ব্লক নির্দিষ্ট করে সেগুলোতে সন্ধান কাজ চালানোর জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এনারগাল্ফ, যুক্তরাজ্যের সোকো এবং শিওরাস্ট্রিম নামের কোম্পানিকে। মধ্য সমতল অঞ্চলে উগান্ডা সীমান্তের লাগোয়া লেক কিভুতেও তেল রয়েছে। কিন্তু হ্রদের লাগোয়া এলাকায় উগান্ডা এরই মধ্যে ভালো মানের তেল তুলছে। ফলে এখানে বেড়েছে উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতা। কঙ্গোতে তেলসংশ্লিষ্ট নানাপর্যায়ের কাজে জড়িত রয়েছে শেল, ফিনা, টোটাল, এনজেন, কোবিল, কঙ্গো অয়েল ও কোহাইড্রো।

এ দেশটিতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি নথিতে বলা হয় : নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ২৬ ট্রিলিয়ন বা ২৬ লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলো সবল করা ইত্যাদি উদ্যোগ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করছে। এজন্য দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুবিধা। এ সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ছাড়, মুনাফার ওপর করসহ বিভিন্ন কর রেয়াত, বিদেশী বিনিয়োগ ও সম্পদ নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ দলিলেই বলা হয় : কঙ্গোতে রয়েছে নগর অঞ্চলে অবস্থানরত বিপুল শ্রম। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ বিদ্যালয় উত্তীর্ণ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। তবে দক্ষ শ্রমের ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুঁজি আনা-নেওয়া প্রসঙ্গে এ নথিতে বলা হয় : কঙ্গো থেকে পুঁজি রফতানিতে এবং অন্যত্র সরাসরি বিনিয়োগের ব্যাপারে কোনো নীতি নেই। অর্থাৎ  পুঁজির চলাচল অবাধ অনিয়ন্ত্রিত। এরই মধ্যে কঙ্গোতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখা দিয়েছে শেভরন অয়েল (কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি কঙ্গো গাল্ফ অয়েলকে সঙ্গে নিয়ে), সিটি ব্যাংক, টেলেসেল, মবিল। এসব তেল, ব্যাংক আর টেলিফোন কোম্পানির সঙ্গে একইসারিতে রয়েছে বিয়ার তৈরির কোম্পানি ব্র্যালিমা ও ইউনিব্রা, সিগারেট তৈরির কোম্পানি টোবাকঙ্গো/রথম্যান ও বিএটিকঙ্গো, পাইকারি ব্যবসায়ী হাসন গ্রুপ, পাম তেল শোধনের কোম্পানি পিএলসি।

একটি দেশের সম্পদ প্রকৃত অর্থে লুট করার জন্য আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে। সম্পদ আছে, সে সম্পদ নির্বিঘ্নে লুট করার জন্য রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এ সংক্রান্ত সব কাজ সুরক্ষার জন্য আছে আইনের আশ্রয়, আছে শ্রম, আছে মুনাফা সরিয়ে নেওয়ার পথে কোনো বাধা না রাখার আশ্বাস। এসবের মাথায় আছে অনুগত রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

কোম্পানিরা আসছে, বিনিয়োগ করছে, বিনিয়োগের জায়গা বাছাই চলছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শুরু হচ্ছে প্রতিযোগিতা। কেবল খেয়াল রাখা হচ্ছে, এই হুড়োহুড়িতে সবেমাত্র দাঁড় করানো কাঠামো যেন হুড়মুড় করে ভেঙে না পড়ে। এক দফায় লুট চলল বিনিয়োগ নিরাপদ করার আইন না মেনে, আক্ষরিকভাবেই লুট। কিন্তু তাতে কিছু বিনিয়োগকারীর অসুবিধা হয়। তাছাড়া ও পথে লুট পুরোমাত্রায় করা যায় না। তাই আয়োজন হয় গৃহযুদ্ধের আগুন নেভানোর। সে কাজে জাতিসংঘের সাহায্যও পাওয়া যায়। জাতিসংঘ শান্তি কায়েমের যে কাজটি করে দেয়, তার খরচ পড়ে কম। এ হিসাবও করেছে বার্তা সংস্থাগুলো। সব ঠিকঠাক চললে, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে মুনাফা আহরণের হার খারাপ হয় না; গায়েও লেপ্টে থাকে না লুটেরার লেবাস।

কিন্তু পুঁজির প্রতিযোগিতা চলে। স্থিতাবস্থার কাঠামোর মধ্যেই চেষ্টা চলে প্রতিযোগিতার মীমাংসা করার। গোপন থাকে না বহু বিষয়। ফলে খবর বেরোয় : ব্রিটিশ তেল কোম্পানি টাল্লো ও ব্রিটিশ দূতাবাস বিতর্কিত চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে কঙ্গো হারাতে পারে ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলার। বিতর্কিত এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেয় তেল বিষয়ে নজর রাখে এমন একটি সংগঠন। এ সংগঠনের নাম প্ল্যাটফর্ম।

এ কাজে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ছিল আফ্রিকান ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি গভর্নেন্স। চুক্তিটি হচ্ছে প্রডাকশন শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি। প্ল্যাটফর্ম এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বিশ্লেষণও প্রকাশ করে। এ বিশ্লেষণে বলা হয় : অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করা হয় চুক্তি মারফত। এর খেসারত দেবেন কঙ্গোর গরিব মানুষ। টাল্লোর চুক্তি বহাল হলে যে হাজার কোটি ডলার রাজস্ব সরকার হারাবে, সেটা দেশটির পুরো জাতীয় ঋণের সমান। এ চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য টাল্লো এবং কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় ব্রিটিশ দূতাবাস জোর লবিং বা দেনদরবার করছে। চুক্তিটি সম্পাদিত হলে আফ্রিকার সব চেয়ে গরিবদের একাংশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ হস্তান্তরিত হবে ব্রিটিশ ও আইরিশ বিনিয়োগকারীদের কাছে। এ বিশ্লেষণ ছাড়াও প্ল্যাটফর্ম পরিকল্পিত চুক্তিটির কয়েকটি দিক তুলে ধরে, যা কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণীয় নয়। যেমন তেল কোম্পানিগুলো ও সশস্ত্র উপদলগুলোর মধ্যে দোস্তি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে আবার শুরু করবে সম্পদ দখলের লড়াই; প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে ফেলার আইনসম্মত অধিকার প্রদান; পরিবেশের কোনো ক্ষতি হলে দন্ড প্রদানের ব্যবস্থা একটুও নেই এবং চুক্তির এমন একটি ধারা, যা কঙ্গোর পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধা দেবে। এগুলো রয়েছে চুক্তির ২১, ২৪, ২৬, ২৭ ও ৩৩ পৃষ্ঠায়।

এমন আরো উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রতিযোগিতায় অনেক সময় স্বচ্ছতা থাকে না। যেমন দেশটির পূর্বাঞ্চলে ১ ও ২ নম্বর ব্লক দেওয়া হলো দুটি কোম্পানিকে। এ দুটি কোম্পানি মিলে গঠন করতে চলেছে স্থানীয় একটি কোম্পানি। এতে দু’কোম্পানির মালিকানা থাকবে ৮৫ শতাংশ আর কঙ্গো রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে ১৫ শতাংশ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এতে কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি কোহাইড্রোর কোনো অংশ নেই। সেই সঙ্গে বিদেশী কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগকারীদের পরিচয় জানানো হচ্ছে না। আবার এ দুটি কোম্পানি শুরু করেছিল একটি ট্রাস্ট। কোম্পানি দুটির একটি হচ্ছে লগ্নি বিনিয়োগকারী, অপরটি হচ্ছে শিল্প বিনিয়োগকারী। জেনেভার যে আইনজীবী এ কোম্পানি দুটির প্রতিনিধি এবং ট্রাস্টটি পরিচালনা করেন, তিনি পাওয়ার অব এটর্নি সংক্রান্ত কাগজপত্র হস্তান্তর করেছেন যাদের কাছে, তাদের আবার কোম্পানি দুটিতে কোনো অংশীদারিত্ব নেই। রয়টারের এক খবর বলা হয়, এ দুটি ব্লকের জন্য চুক্তি করেছে টাল্লো। সঙ্গে আছে হেরিটেজ ও কোহাইড্রো।পুরো ব্যাপারটি হয়ে উঠেছে বড্ড ঘোরপ্যঁাচের।

পুঁজির জগতই এমন। আইনের ছায়ার নিচে আশ্রয় নিয়ে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে নানা দেওয়া-নেওয়া হয়, যা আইনের হাতে ধরা পড়বে না। আর এমন ঘোরালা-প্যঁাচালো দেওয়া-নেওয়া সহজ হয় অস্বচ্ছতার আবরণে। এ অস্বচ্ছতার আবরণ বিষয়গুলোকে জনসাধারণের চোখের আড়ালে রাখতে সাহায্য করে। একদিকে রাখা হয় ঘোরপ্যাচ, আরেক দিকে অস্বচ্ছতা। ফলে ‘আইনসম্মতভাবে’ লুটের কাজটি হয় সহজ।

এ ব্লক দুটিতে অর্থাৎ ১ আর ২তে ইতালির বড় তেল কোম্পানি এনিরও আগ্রহ রয়েছে। ফলে হয়তো আবার হবে লেনদেন এনির সঙ্গে ওই দু’কোম্পানির, কঙ্গোর তেল প্রবাহিত হবে নল দিয়ে, তেল বিক্রির মুনাফা উঠবে কয়েকজনের ঘরে এবং কঙ্গোর মানুষ এত কান্ডের কিছুই জানবেন না।

কঙ্গোতে স্বার্থ অনেকেরই। তেলের খোঁজ যতই পাওয়া যাচ্ছে, ততই স্বার্থ গভীর হচ্ছে, বাড়ছে আগ্রহ। কেবল প্রধান প্রধান শক্তিধর দেশ নয়, অন্যান্য দেশেরও স্বার্থ রয়েছে। কঙ্গোতে ২৫টি আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে কানাডার খনি কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। দেশটিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোর খনি কোম্পানি। এ তথ্য মার্কেটলাইন বিজিনেস ইনফরমেশন সেন্টারের, এংলোগেল্ডি অশান্তির এবং বিভিন্ন কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের। এসব কোম্পানির বিনিয়োগ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ লাখ কোটি, লাখ কোটি ডলার। গৃহযুদ্ধের অস্থিরতায় এত বিনিয়োগ সম্ভব ছিল না। হানাহানি সংঘাতের ডামাডোলে সরাসরি লুট সম্ভব। শ্রমকে শৃঙ্খলে বেঁধে সম্পদ তুলে, অতিরিক্ত শ্রম আত্মসাৎ করে মুনাফা ঘরে তুলতে দরকার হয় স্থিতিশীলতা, কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা শান্তি। এ স্থিতিশীলতা, এ শান্তি পুঁজির, মুনাফার, বাড়তি মেহনত আত্মসাতের। মেহনতের প্রসঙ্গ আসছে এ কারণে যে, মেহনত যোগ না হলে মাটির গভীর থেকে কোনো সম্পদ তোলা হতো না। খনির গর্ভ থেকে সম্পদ আহরণে কল বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সে কলও তো চালায় মেহনত, মানুষের মেহনত।

এত অর্থ যেখানে বিনিয়োজিত হয়, সেখানে আরো অর্থের উৎস রয়েছে। আর এত কোম্পানির এত অর্থ সেখানে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রেষারেষি উৎস হিসেবেও কাজ করে। আইনের কাঠামোর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতার, ভাগাভাগির মীমাংসা না হলে সে মীমাংসা হয় আইনের কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-রীতির বাইরে। তখনই রাজনীতিতে আসে হানাহানি পিছু পিছু আসে রক্তপাত। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে খনির কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা এ বছরের গোড়ার দিকে তা তুলে নেন। ফলে কাজ শুরু হবে খনি থেকে সম্পদ আহরণের; শুরু হবে প্রতিযোগিতা, লেনদেন; তৈরি হবে আগামীর হানাহানি, রক্তপাতের পটভূমি। হয়তো গজিয়ে উঠবে নতুন নতুন বিদ্রোহী গ্রুপ। সব কিছুর আড়ালে থাকবে পুঁজির হাত।

কঙ্গোর ৫ নম্বর ব্লকে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি (উভাচু) করেছে ডোমিনিয়ন পেট্রোলিয়াম, সঙ্গে আছে সোকো ইন্টারন্যাশনাল ও কোহাইড্রো। এ খবরও বার্তা সংস্থা রয়টারের। উগান্ডা সীমান্তে এ ব্লকে  তেল তোলা নিয়ে উগান্ডার সঙ্গে কঙ্গোর রয়েছে রেষারেষি। কঙ্গোর আটলান্টিক উপকূলে দুটি উভাচু করেছে শিওরস্ট্রিম নামের এক কোম্পানি। এ কোম্পানির প্রধান হচ্ছেন সেনেগালের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি এর আগে কঙ্গোয় শান্তি আলোচনায় সাহায্য করেছিলেন। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট এক ডিক্রি বলে এ চুক্তির ব্যবস্থা করেন। লেনদেনটি চমৎকার নয় কি?

কঙ্গোয় আরো তেলের ও গ্যাসের খোঁজ চলছে। তেল কোম্পানিগুলো ধারণা করছে ভালো মানের অনেক তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে; হয়তো তা হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি তেল-গ্যাস মজুদগুলোর অন্যতম। ফলে দেশটির আশপাশে দূরদেশী প্রভুর সৈন্যদের আনাগোনার খবরে কেউই অবাক হবেন না। কঙ্গোর মানুষও আশ্চর্যবোধ করবেন না। তেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো কঙ্গোর জনগণের বিধিলিপি এ মুহূর্তে রচিত হচ্ছে কোনো দূর দেশের রাজধানীতে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, তেল কোম্পানির সদর দফতরে, হয়তো কোনো সেনানায়ক ছক তৈরি করছেন সেনা মোতায়েনের। সম্পদ কি তা হলে দুর্ভোগ-রক্ত-কান্না ডেকে আনে?

Friday, October 21, 2011

যুদ্ধে জড়িত কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি

মবুতুর পরে ক্ষমতায় বসানো হলো লরেন্ট কাবিলাকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ অনুগত মিত্র। কাবিলা প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে, ১৯৯৭ সালে একজন প্রতিনিধি পাঠালেন কানাডার টরেন্টোতে। উদ্দেশ্য : বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। কাবিলার বাহিনী গোমা দখলের পর পরই, ১৯৯৭ সালে, আমেরিকান মিন্যারাল ফিল্ডস (এএমএফ) নামের কোম্পানি কাবিলার সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এ এলাকায় দস্তা, তামা ও কোবাল্ট খনিগুলো থেকে খনিজ সম্পদ আহরণের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয় এএমএফকে। এ কোম্পানির প্রধান ছিলেন মাইক ম্যাকমরো। মাইক আবার যুক্তরাষ্ট্রের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বন্ধু। আর এ চুক্তি সম্পাদনে কাবিলার পক্ষে আলোচনা করেছিলেন কঙ্গোর যে লোকটি, তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে আগেই উল্লেখ করা ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে।

ঘটনা, সম্পদ লুটের ঘটনাগুলো খেয়াল করে দেখলে এভাবে বন্ধুত্ব, যোগসাজশ, ইত্যাদি চোখে পড়ে। হানাহানি, হামলা, যুদ্ধ চলতে থাকল। এ সবে সামনাসামনি জড়িয়ে থাকল উগান্ডা, রুয়ান্ডা প্রভৃতি দেশ; আড়ালে রইল বহুজাতিক করপোরেশন (বক), আর বকদের আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র শক্তিগুলো। উগান্ডা ও রুয়ান্ডা চেয়েছে স্ব স্ব দেশের সীমান্ত বরাবর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে। কাবিলা গোটা দেশ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। উপরে উল্লেখিত বইতে বলা হয়েছে, কাবিলার সেনাবাহিনী ও বিরোধী কোঙ্গোলিজ র‌্যালি ফর ডেমোক্র্যাসি নামের বাহিনীকে, দু’পক্ষকেই মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে সংঘাত বেড়েছে, দেশটির অস্থিতিশীলতা বেড়েছে; ফলে বিদেশী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার জন্যই সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়েছে দেশটিকে স্থিতিহীন রাখার।

রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; রুয়ান্ডার সৈন্যদের ও বিদ্রোহী সশস্ত্র দলগুলোকে যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো সেনারা। রুয়ান্ডা কঙ্গোতে সেনাবাহিনী পাঠানোর আগে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট সফর করেছিলেন পেন্টাগন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর। এমনকি, এ সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে রুয়ান্ডা কঙ্গোয় অভিযান শুরু করার আগেই, ১৯৯৮ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই কঙ্গোতে ঢুকে পড়া রুয়ান্ডার সৈন্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দেখা গেছে। আগে উল্লিখিত ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে এসব তথ্য রয়েছে।

এদিকে, কঙ্গো-রুয়ান্ডা সীমান্তে রুয়ান্ডার সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে দেয় সামরিক বিষয়ে ঠিকাদার কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে কোম্পানি। এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি হ্যালিবার্টনের সাবসিডিয়ারি। এ ঘাঁটিতে রুয়ান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আবার, উপগ্রহের মাধ্যমে সংগ্রহ করা মানচিত্র ও ছবি কাবিলাকে যোগান দেয় বেকটেল করপোরেশন। এগুলো কাবিলাকে দেওয়া হতো যাতে মবুতুর সৈন্যদের চলাচলের হালনাগাদ খবর ও অবস্থান কাবিলা জানতে পারেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি বেকটেলয়ের পরিচালকমন্ডলীতে বা প্রধান পদে যারা আছেন/ছিলেন, তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন। এদের মধ্যে জর্জ শুলজ, কাসপার ওয়েইনবার্গার প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। আবার, ডিক চেনি এক সময়ে ছিলেন হ্যালিবার্টনের প্রধান। কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুটয়ের মালিক আবার হেলিবার্টন, কেইথ হারমন স্নো ‘দ্য ওয়ার দ্যাট ডিড নট মেক দ্য হেডলাইনস : ওভার ফাইভ মিলিয়ন ডেড ইন কঙ্গো’ প্রবন্ধে লিখেছেন : মানবাধিকার বিষয়ে দলনিরপেক্ষ একজন তদন্তকারী দেখেছেন যে, মিলিটারি প্রফেশনাল রিসোর্সেস ইনকরপোরেটেড এবং কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি দুটির সঙ্গে পেন্টাগনের সম্পর্ক রয়েছে।

এবার লুটের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি। তার ভাই সলিম সালেহ। তিনি তিনটি বিমান ইজারা দিলেন উগান্ডার সামরিক বাহিনীকে। এ বিমানগুলো কঙ্গোতে সৈন্য ও সামগ্রী সরবরাহের কাজে লাগানো হলো। উগান্ডার সেনা কর্তাবৃন্দ, কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলো ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগসাজশে সালেহ নিশ্চিত করলেন যে, ফেরত পথে বিমানগুলো যেন বোঝাই থাকে সোনা, কাঠ, কফি দিয়ে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। রুয়ান্ডায় হীরা খনি নেই। অথচ রুয়ান্ডা ১৯৯৮ সালে ১৬৬ ক্যারেট হীরা রফতানি করে। আর তা ২০০০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৫০০ ক্যারেটে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। পাশ্চাত্যের বিশাল খনি কোম্পানি বারিক গোল্ড করপোরেশন। এটি কানাডীয় কোম্পানি। কঙ্গোর খনি সম্পদে এ কোম্পানির রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। এ কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর পরিচয়? কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরোনে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উপদেষ্টা ভার্নন জর্ডান। এ কোম্পানির উপদেষ্টাদের একজন হচ্ছেন জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ, যাকে সংক্ষেপে জর্জ ডব্লু বুশ বা জর্জ বুশ নামে পৃথিবীর মানুষ চেনেন।

কঙ্গো থেকে সুবিধা পেয়েছে যেসব কোম্পানি, সেগুলোর অন্যতম কানাডার হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। উগান্ডা আর রুয়ান্ডার সামরিক বাহিনী ১৯৯৮ সালে যখন কঙ্গোর মাটিতে পা রাখল, সে সময়েই সেখানে পৌঁছায় হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ব্যাংক পাঁচ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ডলার কর্জ দেয় কঙ্গোয় রুয়ান্ডা সমর্থিত বিদ্রোহী দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। আর, রুয়ান্ডা ও উগান্ডা যখন কঙ্গোয় লুট চালাচ্ছে, সে সময়েই এ দু’দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ছে বলে এ দু’দেশ প্রশংসা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের।

উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলো পরিবেশিত হয়েছে ইতোমধ্যে উল্লেখ করা এ গেম এজ অ্যান্ড… বইতে। সত্য যে কোথায় কোনটি, তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের তথ্য বিপুল। একের পর এক এসব তথ্য সাজালে সহজেই কয়েকটি বই লেখা যায়। এসব তথ্য যথাযথভাবে সংযুক্ত করলে, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক খুঁজে পেলে সত্য আর আড়ালে থাকে না। লুট, হামলা, পেছনে থাকা শক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতির ভালো ভালো কথা, লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার সম্পর্ক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক, ইত্যাদি সত্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। তখন আর বিভ্রান্তি থাকে না এ পৃথিবীর বড় শক্তিদের চেহারা-চরিত্র-বক্তব্য নিয়ে। তবে, এক বিপুল আশ্চর্য তবুও অপেক্ষা করে। সে বিপুল আশ্চর্য হচ্ছে : আজো দেশে দেশে এ শক্তিবর্গের মিত্ররা পরম শ্রদ্ধায় পূজা পান। তারাও ভেবে দেখেন না যে, দেশের সাধারণ মানুষ যেদিন জানতে পারবেন এ পূজনীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এ শক্তিবর্গের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা, সেদিন সাধারণ মানুষই ধিক্কার দেবেন এ ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিবর্গকে। আর, সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তা করেন না, মাঝে মধ্যে করেন। যেমন, আমাদের এ ভূখন্ডেই, আমাদের আজকের বাংলাদেশে, ১৯৪৭ সালের আগে-পরে কতই না শ্রদ্ধা পেতেন মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ। তাকে তো এ দেশেরই মানুষ ধিক্কার দিয়েছেন, প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার কথার প্রতিবাদ করেছেন। কোনো কথাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখতে পারেনি। একইভাবে, দেশে দেশে লুটের সঙ্গে জড়িত যে রাষ্ট্র শক্তি, তার পরম মিত্র, তার আস্থাভাজন লোককে সাধারণ মানুষ কি গ্রহণ করবেন? ধিক্কারে-নিন্দায় উচ্চারিত হবে সে নাম। কারণ, সাধারণ মানুষ কখনোই দেশের সম্মান ও মর্যাদা বলি দেন না। কঙ্গোতেও তাই হয়েছে। বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র শোম্বের নাম আজ আর কেউ উচ্চারণ করেন না শ্রদ্ধায়, সে নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, ধিক্কারে। মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়ে আছেন প্যাট্রিস লুমুমবা।

কঙ্গোর দুর্ভোগের শেষ হয় না। কারণ তার সম্পদ কেবল সোনা, হীরা, কোবাল্টে সীমিত নেই। সেখানে আছে তেল। সে তেলের পরিমাণ একেবারে কম নয়। তাই এ তেল নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং প্রতিযোগিতা প্রবল। ব্রিটেনের পত্রিকা ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায় : কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ৫ নম্বর ব্লক নিয়ে শুরু হয়েছে বিরোধ। এ ব্লকে রয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সেখানে রয়েছে বন, গরিলা, হাতি। এখানে রয়েছে মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো জাতীয় উদ্যান। এ ব্লকটি দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের দুটি তেল কোম্পানিকে। দেশটির আইন অনুসারে জাতীয় উদ্যানে কেবল বৈজ্ঞানিক কাজ চালানো যায়, তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন করা যায় না। দেশটির ৪১ জন এমপি জাতীয় উদ্যানের সীমানা নতুন করে চিহ্নিত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রীর কাছে। প্রতিবেশী উগান্ডায় যুক্তরাজ্যের আরেকটি কোম্পানি, তাল্ল অয়েল সন্ধান পেয়েছে আড়াইশ কোটি ব্যারেল তেলের। এর পর থেকেই তেল তোলার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এ ব্লকে তেল তোলার জন্য পার্টনারশিপ শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি করা হয়। এটা খুব গোপন করে রাখা হয়। এ চুক্তি অনুসারে সিগনেচার বোনাস হিসেবে উৎপাদন দেবে ২০ লাখ ডলার, প্রথম উৎপাদন বোনাস হিসেবে দেবে ২০ লাখ ডলার; আর, একটি বার্ষিক কর দেওয়ার পাশাপাশি এক কোটি ব্যারেল তেল কিনবে ৫০ লাখ ডলারে। মুনাফার ওপরে ভাগাভাগি আছে। এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। সে সংশোধন অনুসারে কিছু অর্থ আবার সিগনেচার বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়। কত পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে অনুমান করা হয়, এ পরিমাণ পাঁচ লাখ ডলার। এ অর্থ দেওয়া হয় চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করার কয়েক সপ্তাহ আগে।

এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তেল কোম্পানিগুলো যে অর্থ দেয়, তার চেয়ে বেশি নিয়ে যায়। তা না হলে এসব কোম্পানি তেল তুলতে আসত না। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দর্শন ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ নয়।

এ লুটের ‘কাহিনী’ বিশাল। তার ধরন অনেক। ব্যক্তি পর্যায়ে, কোম্পানি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে, আইনের ও প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায়, আইন ভেঙে লুট চলে। এ লুট এত ব্যাপক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০০০ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে বলে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন পেশ করেন তাতে এ লুটের একটি দিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

এ প্রতিবেদন ছয়টি উপসংহারে উপনীত হয়। প্রথম উপসংহারেই বলা হয় : গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সংঘাত প্রধানত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রাপ্তি, নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য নিয়ে। এ পাঁচটি খনিজ সম্পদ হলো কোলটান, হীরা, তামা, কোবাল্ট ও সোনা। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ এত যে হতবিহবল হয়ে যেতে হয়। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও আইনহীনতার প্রেক্ষাপটে এ সম্পদ মুঠো না করার প্রলোভন ঠেকানো কঠিন। দ্বিতীয় উপসংহারে বলা হয় : বিদেশী সেনাবাহিনীগুলো সুব্যবস্থিতভাবে কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করছে। তা লুট করা হচ্ছে। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। এসব চক্রের যোগাযোগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তৃতীয় উপসংহারের একটি অংশে বলা হয় : কয়েকটি কোম্পানি কঙ্গোতে যুদ্ধে জড়িত। এসব কোম্পানি যুদ্ধে সরাসরি ইন্ধন যুগিয়েছে। এসব কোম্পানি প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে অস্ত্র যুগিয়েছে। অন্য কয়েকটি কোম্পানি দিয়েছে অর্থ। সে অর্থ খরচ হয়েছে অস্ত্র কেনায়। খনিজ সম্পদের ব্যবসা করে যে কোম্পানিগুলো, তারাই দেশটিতে বেআইনিভাবে খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। লুটের এ কাহিনী আগামীতে আরো তথ্য দেবে।

Thursday, October 6, 2011

লুটের জন্য গণহত্যা (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৪)

এত দুর্ভোগ-দুর্গতি যে কঙ্গোর, সেই কঙ্গো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে ১২০০ সালে। পর্তুগিজ নাবিক দিয়েগো কাও ১৪৮২ সালে আসেন কঙ্গো। তিনিই ছিলেন কঙ্গোয় পদার্পণকারী প্রথম ইউরোপীয়। কঙ্গোর রাজার সঙ্গে পর্তুগালের সম্পর্ক স্থাপিত হয় সে পদার্পণের মধ্য দিয়ে। এর প্রায় সোয়াশ’ বছর পরে শুরু হয় দাস বাণিজ্য, ষোড়শ শতকে ইংরেজ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও ফরাসি বণিকরা আরম্ভ করে মানুষ নিয়ে সে ব্যবসা। তারা সঙ্গে নেয় স্থানীয় সহযোগীদের; দালা, মধ্যস্বত্বভোগীদের। এ বাণিজ্য চলে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত।

বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে উপনিবেশ বানানোর মতলবে গঠন করলেন ব্যক্তিগত ব্যবসা উদ্যোগ; সময় তখন ১৮৭০-এর দশক। দেশটি হয়ে পড়ে রাজা লিওপোল্ডের জমিদারি। শুরু হলো কঙ্গোকে বেলজিয়ামের উপনিবেশকরণ। এর আগেই শুরু হয়েছে আফ্রিকার বিপুল সম্পদ লুট করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইউরোপের সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা। রাবারের চাহিদা বেড়েছে বিপুলভাবে। আর কঙ্গোতে তখন ছিল অনেক রাবার গাছ। তাই বেলজিয়াম রাজের ‘মহতী উদ্যোগ’ কঙ্গোতে। যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবার উৎপাদিত হতো, ততক্ষণ পুরুষ কর্মীদের পরিবারগুলোকে আটকে রাখা হতো। যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবার উৎপাদন করতে পারত না, তাদের দু’হাত কেটে ফেলা হতো। আরো, আরো রাবারের জন্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের যে দাবি, তা প্রতিরোধ করত যারা, তাদেরও ভাগ্যে জুটত দু’হাত কেটে ফেলার ‘পুরস্কার’। এর সঙ্গে ছিল অনাহার, অতি শ্রমে শরীর ভেঙে পড়া, রোগ। এসব আর হত্যা মিলে কঙ্গোতে সে যাত্রা মারা যায় এক কোটি মানুষ। রবার্ট ও’ব্রায়ান এবং মার্ক উইলিয়ামের গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি : ইভোলিউশন অ্যান্ড ডায়নামিক্স বইতে এ তথ্য উল্লেখিত হয়েছে। রবার্ট ও মার্ক আরো লিখেছেন, রাজা লিওপোল্ড যখন কঙ্গো লুট করে চলেছেন, সে সময়ই, বেলজীয় সাম্রাজ্য আর রাবারপতিদের স্বার্থ রক্ষায় সব ‘রাবার চর’ সক্রিয়ভাবে চালাচ্ছে গণহত্যা, নির্যাতন, অত্যাচার।

বার্লিনে ১৮৮৪-৮৫ সালে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সম্মেলনে কঙ্গো অববাহিকায় রাজা লিওপোল্ডের দাবি স্বীকার করে নেওয়া হয়। এ সম্মেলন আহবান করেছিলেন বিসমার্ক। আফ্রিকার মধ্যাঞ্চল নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের মধ্যে যে উত্তেজনা চলছিল, তা দূর করাই ছিল এ ১৫ দেশ সম্মেলনের উদ্দেশ্য। কঙ্গোয় বেলজীয় ও ফরাসি লিপ্সা মেনে নিতে পারছিল না ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ শক্তি। আবার পূর্ব আফ্রিকা ও ক্যামেরুন অঞ্চলে জার্মান সম্প্রসারণও তারা মানতে পারছিল না। তাই উত্তেজনা। এ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বেলজিয়াম রাজ ১৮৮৫ সালে কঙ্গো ফ্রি স্টেট প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করলেন। তিনি হলেন সে ফ্রি স্টেটের প্রধান। কঙ্গোর মানুষ, যাদের রক্তে, শ্রমে এ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি, তারা নিজ দেশে রইলেন পদানত। সাম্রাজ্য-শক্তির কি পরিহাস! সাম্রাজ্য শক্তি এভাবেই সব কালে, সব দেশে স্বনির্মিত ‘সত্য’ জবরদস্ত চাপিয়ে দিয়েছে। তবু সাম্রাজ্যের ক্ষুধা মেটে না। রক্ত ঝরতে থাকে বেলজীয় শক্তিমানরা ১৮৯১-৯২ সালে কাতাঙ্গা দখল করে। এর আগেই, বার্লিন সম্মেলনে কঙ্গো ও নাইজার নদীতে অবাধ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে প্রভাবাধীন এলাকা। এ সবই করা হয়েছে উপনিবেশ বানানোর হুড়োহুড়ি যাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের মধ্যে যুদ্ধ না বাধিয়ে দেয় সে উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ শান্তি বজায় রাখতে হবে লুটের জন্য। লুটেরারা ‘শান্তিপ্রিয়’ কেন হয়, তাদের চাওয়া ‘শাস্তি’ কেমন, চলাচলের অবাধ অধিকার কেন দরকার, এসব স্পষ্ট হয়ে যায় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে। এ ঘটনা আরো দেখিয়ে দেয় : দেশ এক দেশবাসীর, দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে প্রভুরা। এ ঘটনা একটি নয়, সাম্রাজ্যগুলোর ইতিহাসে এমন ঘটনা অনেক। আবার সাম্রাজ্য কেন এমন আচরণ করে, সাম্রাজ্য হয় কিভাবে, কোন শক্তি কাজ করে সাম্রাজ্যের মধ্যে যা সাম্রাজ্যকে নিয়ে যায় অসংখ্য মানুষের রক্ত আর শ্রম আত্মসাৎ করতে, সে বিষয়গুলোও বুঝতে পারা দরকার লুট, হত্যার ইতিহাস বুঝতে পারার জন্য। আজ অবশ্য এ দ্বন্দ্বের কথা অনেকেই অস্বীকার করতে চান হাল্কাচালে বলা চটকদার কথা দিয়ে। ফলে অজানা রয়ে যায় লুটের ইতিহাস। কিন্তু মিলিয়ন মিলিয়ন (দশ লাখে এক মিলিয়ন) মানুষকে ক্রীতদাস বানানোর ঘটনা কি অস্বীকার করা যায়? যায় কি ধন-সম্পদ লিপ্সার।

এ অমানবিক ঘটনা অস্বীকার করা? অন্য আরেক দেশের রাজার জমিদারি হয়ে উঠল এক দেশ! চলতে থাকল মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে দাস বানানো। কেন? গুটিকয় লোকের ভোগের জন্য আরো আরো সম্পদ চাই, সে জন্য। কঙ্গোকে অঙ্গীভূত করে নেয় বেলজিয়াম ১৯০৮ সালে। প্রতিবাদ জানান কঙ্গোর মানুষ। সে প্রতিবাদ দমনে রাজা লিওপোল্ডের চরেরা গণহারে, নির্বিচারে চালায় খুন, হত্যা, নির্যাতন।

ইতিহাসের তথ্য বলে : রাজা লিওপোল্ডের কঙ্গো জমিদারিতে কঙ্গোর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে হয় হত্যা করা হয়েছে, নতুবা তারা অন্যের জন্য সম্পদ তৈরিতে বাধ্য হয়ে কাজ করতে করতে মারা গেছেন, এখানে রয়েছে দ্বন্দ্ব : কতিপয়ের সম্পদ আর অগণিতের মেহনত। অর্থাৎ অগণিত সাধারণ মানুষের মেহনতে তৈরি হয় যে সম্পদ, তা যায় কয়েক লোকের ভোগে। এ দ্বন্দ্ব আজ অস্বীকার করে নতুন পথ খোঁজেন কেউ কেউ। কিন্তু অস্বীকার করলেই তো আর দ্বন্দ্ব মিলিয়ে যায় না। তা চলতেই থাকে। যিনি সে দ্বন্দ্ব অস্বীকার করেন, তিনি কেবল অপেক্ষা করেন বোকা হওয়ার মুহূর্তটির জন্য। কঙ্গোতেও হলো তাই।

স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলো। রক্তাক্ত সে সংগ্রাম। সে লড়াইতে দেশটি ক্ষত-বিক্ষত, কঙ্গো খন্ড খন্ড হওয়ার অবস্থা। উপনিবেশটির ওপর সাম্রাজ্যবাদী প্রভু বেলজিয়াম নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। অবশেষে ১৯৬০ সালে কঙ্গো স্বাধীনতা অর্জন করে। দেশটির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন প্যাট্রিস লুমুমবা। শুরু হয় আরেক রক্তাক্ত অধ্যায়ের। চক্রান্ত আর হত্যাকান্ডে পূর্ণ সে অধ্যায়। সে অধ্যায়তেও নাটের গুরু ধনশালীরা, তাদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো আর এদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।