Showing posts with label কঙ্গো. Show all posts
Showing posts with label কঙ্গো. Show all posts

Thursday, November 3, 2011

কেবলই দুর্ভোগ কান্না-রক্ত (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৮)

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের খনিজ সম্পদের প্রসঙ্গ উঠলেই দেশটির হীরা, সোনা আর কোলটানের কথা ওঠে। দেশটির ইন্ধন সম্পদও কম নয়। এ সম্পদ এখন ক্রমান্বয়ে আগ্রহীদের চোখে পড়ছে। দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস ও কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুদ। এছাড়া পানি বিদ্যুৎ তৈরির সম্ভাবনাও বিপুল। প্রায় এক লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে দেশটিতে। এ পরিমাণ হচ্ছে বিশ্বে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের প্রায় ১৩ শতাংশ। এসবই দেশটির প্রতি আকৃষ্ট করছে মুনাফা সন্ধানকারীদের।

আফ্রিকার দক্ষিণ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অশোধিত তেলের মজুদ এঙ্গোলার পরেই; অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানীয়। দেশটির অশোধিত তেলের মজুদ ২০০৯ সালের হিসাব অনুসারে ছিল ১৮ কোটি ব্যারেল। তেল ও গ্যাস বিষয়ে দেশটি প্রথমবারের মতো সম্মেলন আয়োজন করে ২০০৮ সালের মধ্য আগস্টে। এ খবর জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার।

দেশটিতে তেল খোঁজার কাজ শুরু হয় গত শতকের ষাটের দশকে। সেখানে উপকূলের কাছে সাগরে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। ভূ-ভাগে তেল তোলা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। এ তোলার কাজ ১৯৮৬ সালে চলছিল আটটি তেল ক্ষেত্র থেকে। এরপর থেকে তেল আহরণের কাজ বেড়ে চলে। এ ঘটনা ধারার সঙ্গে দেশটিতে হানাহানি-সংঘাত-যুদ্ধের এবং এসব হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির জ্বালানি জরিপ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় : কঙ্গোতে তেলের প্রমাণিত মজুদ বিপুল। গ্যাসও তেমন আছে। তেলের ওপর ভিত্তি করেই দেশটির সবল অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। স্থলভাগে তেল-গ্যাস যা আছে, তাতে হাতের ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে। উপকূলের কাছে তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল তুলছে ফ্রান্সের পেরেনকো, জাপানের টেইকোকু, যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন টেক্সাকো। স্থলভাগে, উপকূল অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গা তেল তুলছে পেরেনকো এবং কঙ্গোর তেল কোম্পানির কোহাইড্রো। আরো ছয়টি ব্লক নির্দিষ্ট করে সেগুলোতে সন্ধান কাজ চালানোর জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এনারগাল্ফ, যুক্তরাজ্যের সোকো এবং শিওরাস্ট্রিম নামের কোম্পানিকে। মধ্য সমতল অঞ্চলে উগান্ডা সীমান্তের লাগোয়া লেক কিভুতেও তেল রয়েছে। কিন্তু হ্রদের লাগোয়া এলাকায় উগান্ডা এরই মধ্যে ভালো মানের তেল তুলছে। ফলে এখানে বেড়েছে উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতা। কঙ্গোতে তেলসংশ্লিষ্ট নানাপর্যায়ের কাজে জড়িত রয়েছে শেল, ফিনা, টোটাল, এনজেন, কোবিল, কঙ্গো অয়েল ও কোহাইড্রো।

এ দেশটিতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি নথিতে বলা হয় : নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ২৬ ট্রিলিয়ন বা ২৬ লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলো সবল করা ইত্যাদি উদ্যোগ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করছে। এজন্য দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুবিধা। এ সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ছাড়, মুনাফার ওপর করসহ বিভিন্ন কর রেয়াত, বিদেশী বিনিয়োগ ও সম্পদ নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ দলিলেই বলা হয় : কঙ্গোতে রয়েছে নগর অঞ্চলে অবস্থানরত বিপুল শ্রম। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ বিদ্যালয় উত্তীর্ণ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। তবে দক্ষ শ্রমের ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুঁজি আনা-নেওয়া প্রসঙ্গে এ নথিতে বলা হয় : কঙ্গো থেকে পুঁজি রফতানিতে এবং অন্যত্র সরাসরি বিনিয়োগের ব্যাপারে কোনো নীতি নেই। অর্থাৎ  পুঁজির চলাচল অবাধ অনিয়ন্ত্রিত। এরই মধ্যে কঙ্গোতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখা দিয়েছে শেভরন অয়েল (কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি কঙ্গো গাল্ফ অয়েলকে সঙ্গে নিয়ে), সিটি ব্যাংক, টেলেসেল, মবিল। এসব তেল, ব্যাংক আর টেলিফোন কোম্পানির সঙ্গে একইসারিতে রয়েছে বিয়ার তৈরির কোম্পানি ব্র্যালিমা ও ইউনিব্রা, সিগারেট তৈরির কোম্পানি টোবাকঙ্গো/রথম্যান ও বিএটিকঙ্গো, পাইকারি ব্যবসায়ী হাসন গ্রুপ, পাম তেল শোধনের কোম্পানি পিএলসি।

একটি দেশের সম্পদ প্রকৃত অর্থে লুট করার জন্য আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে। সম্পদ আছে, সে সম্পদ নির্বিঘ্নে লুট করার জন্য রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এ সংক্রান্ত সব কাজ সুরক্ষার জন্য আছে আইনের আশ্রয়, আছে শ্রম, আছে মুনাফা সরিয়ে নেওয়ার পথে কোনো বাধা না রাখার আশ্বাস। এসবের মাথায় আছে অনুগত রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

কোম্পানিরা আসছে, বিনিয়োগ করছে, বিনিয়োগের জায়গা বাছাই চলছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শুরু হচ্ছে প্রতিযোগিতা। কেবল খেয়াল রাখা হচ্ছে, এই হুড়োহুড়িতে সবেমাত্র দাঁড় করানো কাঠামো যেন হুড়মুড় করে ভেঙে না পড়ে। এক দফায় লুট চলল বিনিয়োগ নিরাপদ করার আইন না মেনে, আক্ষরিকভাবেই লুট। কিন্তু তাতে কিছু বিনিয়োগকারীর অসুবিধা হয়। তাছাড়া ও পথে লুট পুরোমাত্রায় করা যায় না। তাই আয়োজন হয় গৃহযুদ্ধের আগুন নেভানোর। সে কাজে জাতিসংঘের সাহায্যও পাওয়া যায়। জাতিসংঘ শান্তি কায়েমের যে কাজটি করে দেয়, তার খরচ পড়ে কম। এ হিসাবও করেছে বার্তা সংস্থাগুলো। সব ঠিকঠাক চললে, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে মুনাফা আহরণের হার খারাপ হয় না; গায়েও লেপ্টে থাকে না লুটেরার লেবাস।

কিন্তু পুঁজির প্রতিযোগিতা চলে। স্থিতাবস্থার কাঠামোর মধ্যেই চেষ্টা চলে প্রতিযোগিতার মীমাংসা করার। গোপন থাকে না বহু বিষয়। ফলে খবর বেরোয় : ব্রিটিশ তেল কোম্পানি টাল্লো ও ব্রিটিশ দূতাবাস বিতর্কিত চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে কঙ্গো হারাতে পারে ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলার। বিতর্কিত এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেয় তেল বিষয়ে নজর রাখে এমন একটি সংগঠন। এ সংগঠনের নাম প্ল্যাটফর্ম।

এ কাজে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ছিল আফ্রিকান ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি গভর্নেন্স। চুক্তিটি হচ্ছে প্রডাকশন শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি। প্ল্যাটফর্ম এ চুক্তিটি ফাঁস করে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বিশ্লেষণও প্রকাশ করে। এ বিশ্লেষণে বলা হয় : অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করা হয় চুক্তি মারফত। এর খেসারত দেবেন কঙ্গোর গরিব মানুষ। টাল্লোর চুক্তি বহাল হলে যে হাজার কোটি ডলার রাজস্ব সরকার হারাবে, সেটা দেশটির পুরো জাতীয় ঋণের সমান। এ চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য টাল্লো এবং কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় ব্রিটিশ দূতাবাস জোর লবিং বা দেনদরবার করছে। চুক্তিটি সম্পাদিত হলে আফ্রিকার সব চেয়ে গরিবদের একাংশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ হস্তান্তরিত হবে ব্রিটিশ ও আইরিশ বিনিয়োগকারীদের কাছে। এ বিশ্লেষণ ছাড়াও প্ল্যাটফর্ম পরিকল্পিত চুক্তিটির কয়েকটি দিক তুলে ধরে, যা কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণীয় নয়। যেমন তেল কোম্পানিগুলো ও সশস্ত্র উপদলগুলোর মধ্যে দোস্তি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে আবার শুরু করবে সম্পদ দখলের লড়াই; প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে ফেলার আইনসম্মত অধিকার প্রদান; পরিবেশের কোনো ক্ষতি হলে দন্ড প্রদানের ব্যবস্থা একটুও নেই এবং চুক্তির এমন একটি ধারা, যা কঙ্গোর পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধা দেবে। এগুলো রয়েছে চুক্তির ২১, ২৪, ২৬, ২৭ ও ৩৩ পৃষ্ঠায়।

এমন আরো উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রতিযোগিতায় অনেক সময় স্বচ্ছতা থাকে না। যেমন দেশটির পূর্বাঞ্চলে ১ ও ২ নম্বর ব্লক দেওয়া হলো দুটি কোম্পানিকে। এ দুটি কোম্পানি মিলে গঠন করতে চলেছে স্থানীয় একটি কোম্পানি। এতে দু’কোম্পানির মালিকানা থাকবে ৮৫ শতাংশ আর কঙ্গো রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে ১৫ শতাংশ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এতে কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি কোহাইড্রোর কোনো অংশ নেই। সেই সঙ্গে বিদেশী কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগকারীদের পরিচয় জানানো হচ্ছে না। আবার এ দুটি কোম্পানি শুরু করেছিল একটি ট্রাস্ট। কোম্পানি দুটির একটি হচ্ছে লগ্নি বিনিয়োগকারী, অপরটি হচ্ছে শিল্প বিনিয়োগকারী। জেনেভার যে আইনজীবী এ কোম্পানি দুটির প্রতিনিধি এবং ট্রাস্টটি পরিচালনা করেন, তিনি পাওয়ার অব এটর্নি সংক্রান্ত কাগজপত্র হস্তান্তর করেছেন যাদের কাছে, তাদের আবার কোম্পানি দুটিতে কোনো অংশীদারিত্ব নেই। রয়টারের এক খবর বলা হয়, এ দুটি ব্লকের জন্য চুক্তি করেছে টাল্লো। সঙ্গে আছে হেরিটেজ ও কোহাইড্রো।পুরো ব্যাপারটি হয়ে উঠেছে বড্ড ঘোরপ্যঁাচের।

পুঁজির জগতই এমন। আইনের ছায়ার নিচে আশ্রয় নিয়ে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে নানা দেওয়া-নেওয়া হয়, যা আইনের হাতে ধরা পড়বে না। আর এমন ঘোরালা-প্যঁাচালো দেওয়া-নেওয়া সহজ হয় অস্বচ্ছতার আবরণে। এ অস্বচ্ছতার আবরণ বিষয়গুলোকে জনসাধারণের চোখের আড়ালে রাখতে সাহায্য করে। একদিকে রাখা হয় ঘোরপ্যাচ, আরেক দিকে অস্বচ্ছতা। ফলে ‘আইনসম্মতভাবে’ লুটের কাজটি হয় সহজ।

এ ব্লক দুটিতে অর্থাৎ ১ আর ২তে ইতালির বড় তেল কোম্পানি এনিরও আগ্রহ রয়েছে। ফলে হয়তো আবার হবে লেনদেন এনির সঙ্গে ওই দু’কোম্পানির, কঙ্গোর তেল প্রবাহিত হবে নল দিয়ে, তেল বিক্রির মুনাফা উঠবে কয়েকজনের ঘরে এবং কঙ্গোর মানুষ এত কান্ডের কিছুই জানবেন না।

কঙ্গোতে স্বার্থ অনেকেরই। তেলের খোঁজ যতই পাওয়া যাচ্ছে, ততই স্বার্থ গভীর হচ্ছে, বাড়ছে আগ্রহ। কেবল প্রধান প্রধান শক্তিধর দেশ নয়, অন্যান্য দেশেরও স্বার্থ রয়েছে। কঙ্গোতে ২৫টি আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে কানাডার খনি কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। দেশটিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোর খনি কোম্পানি। এ তথ্য মার্কেটলাইন বিজিনেস ইনফরমেশন সেন্টারের, এংলোগেল্ডি অশান্তির এবং বিভিন্ন কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের। এসব কোম্পানির বিনিয়োগ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ লাখ কোটি, লাখ কোটি ডলার। গৃহযুদ্ধের অস্থিরতায় এত বিনিয়োগ সম্ভব ছিল না। হানাহানি সংঘাতের ডামাডোলে সরাসরি লুট সম্ভব। শ্রমকে শৃঙ্খলে বেঁধে সম্পদ তুলে, অতিরিক্ত শ্রম আত্মসাৎ করে মুনাফা ঘরে তুলতে দরকার হয় স্থিতিশীলতা, কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা শান্তি। এ স্থিতিশীলতা, এ শান্তি পুঁজির, মুনাফার, বাড়তি মেহনত আত্মসাতের। মেহনতের প্রসঙ্গ আসছে এ কারণে যে, মেহনত যোগ না হলে মাটির গভীর থেকে কোনো সম্পদ তোলা হতো না। খনির গর্ভ থেকে সম্পদ আহরণে কল বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সে কলও তো চালায় মেহনত, মানুষের মেহনত।

এত অর্থ যেখানে বিনিয়োজিত হয়, সেখানে আরো অর্থের উৎস রয়েছে। আর এত কোম্পানির এত অর্থ সেখানে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রেষারেষি উৎস হিসেবেও কাজ করে। আইনের কাঠামোর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতার, ভাগাভাগির মীমাংসা না হলে সে মীমাংসা হয় আইনের কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-রীতির বাইরে। তখনই রাজনীতিতে আসে হানাহানি পিছু পিছু আসে রক্তপাত। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে খনির কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা এ বছরের গোড়ার দিকে তা তুলে নেন। ফলে কাজ শুরু হবে খনি থেকে সম্পদ আহরণের; শুরু হবে প্রতিযোগিতা, লেনদেন; তৈরি হবে আগামীর হানাহানি, রক্তপাতের পটভূমি। হয়তো গজিয়ে উঠবে নতুন নতুন বিদ্রোহী গ্রুপ। সব কিছুর আড়ালে থাকবে পুঁজির হাত।

কঙ্গোর ৫ নম্বর ব্লকে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি (উভাচু) করেছে ডোমিনিয়ন পেট্রোলিয়াম, সঙ্গে আছে সোকো ইন্টারন্যাশনাল ও কোহাইড্রো। এ খবরও বার্তা সংস্থা রয়টারের। উগান্ডা সীমান্তে এ ব্লকে  তেল তোলা নিয়ে উগান্ডার সঙ্গে কঙ্গোর রয়েছে রেষারেষি। কঙ্গোর আটলান্টিক উপকূলে দুটি উভাচু করেছে শিওরস্ট্রিম নামের এক কোম্পানি। এ কোম্পানির প্রধান হচ্ছেন সেনেগালের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি এর আগে কঙ্গোয় শান্তি আলোচনায় সাহায্য করেছিলেন। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট এক ডিক্রি বলে এ চুক্তির ব্যবস্থা করেন। লেনদেনটি চমৎকার নয় কি?

কঙ্গোয় আরো তেলের ও গ্যাসের খোঁজ চলছে। তেল কোম্পানিগুলো ধারণা করছে ভালো মানের অনেক তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে; হয়তো তা হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি তেল-গ্যাস মজুদগুলোর অন্যতম। ফলে দেশটির আশপাশে দূরদেশী প্রভুর সৈন্যদের আনাগোনার খবরে কেউই অবাক হবেন না। কঙ্গোর মানুষও আশ্চর্যবোধ করবেন না। তেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো কঙ্গোর জনগণের বিধিলিপি এ মুহূর্তে রচিত হচ্ছে কোনো দূর দেশের রাজধানীতে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, তেল কোম্পানির সদর দফতরে, হয়তো কোনো সেনানায়ক ছক তৈরি করছেন সেনা মোতায়েনের। সম্পদ কি তা হলে দুর্ভোগ-রক্ত-কান্না ডেকে আনে?

Thursday, October 27, 2011

কঙ্গোর সংঘাত ও লুটের মাল কোলটান (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৭)

কঙ্গোতে লুটের ‘কাহিনী’ বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয় : সেখানে সংঘাতের ধরনটি লোভনীয়। এ কারণে এ সংঘাত বিবদমান সব পক্ষের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শত্রুরা, বৈরী পক্ষগুলো ব্যবসায়ের শরিক, খনিতে মজুর হিসেবে কাজ করতে হয় বন্দিদের। শত্রুরা একই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অস্ত্র পায়, অস্ত্র বেচাকেনার মধ্যস্থতাকারীরাও একই। ব্যবসা আড়াল করে ফেলেছে নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে। এ ব্যবসা-উদ্যোগে লোকসান হয় কেবল কঙ্গোর জনগণের।

ওপরে উল্লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে সব পাঠকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে কঙ্গোয় লুটের সত্য। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের উপসংহারে আরো নিষ্ঠুর সত্য উচ্চারিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে : এ সংঘাতের ধরন লোভনীয়। তাই বিভিন্ন দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদেরও এ সংঘাত দরকার। এর ফলে সম্পদ নাগালের মধ্যে আসে, এ কমান্ডাররা উপলব্ধি করেছেন যে, যুদ্ধ নিজেই নিজেকে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই এ যুদ্ধ অপরাধীদের জাল তৈরি করেছে।

এতে বলা হয় : দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দাতারা কঙ্গোয় অবস্থানরত সেনাবাহিনীগুলোর সরকারগুলোকে বিভ্রান্তিকর ইঙ্গিত দিয়েছে। এসব উপসংহার স্পষ্টভাবে বলে দেয় কঙ্গোর সম্পদ লুটের সঙ্গে সংঘাতের সম্পর্ক, স্পষ্টভাবে বলে দেয় সম্পদ লুটের সঙ্গে কোন কোন পক্ষ জড়িত। এবং এ মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করেন কোনো দলীয় বা কোনো দেশের পক্ষ অনুযায়ী দেশ নয়, তা করেন জাতিসংঘের একদল বিশেষজ্ঞ। রুয়ান্ডার মধ্য দিয়ে কঙ্গোর খনিজ সামগ্রী আমদানি করে বিভিন্ন দেশের কোম্পানি। রুয়ান্ডার রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাওয়া আংশিক তথ্য থেকে দেখা যায় এসব কোম্পানি হচ্ছে নিম্নোক্ত দেশগুলোর : বেলজিয়াম, জার্মানি, রুয়ান্ডা, মালয়েশিয়া, কানাডা, তাঞ্জানিয়া, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয় : এ লুটের কাজে অাঁতাত রয়েছে সরকারের সঙ্গে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতের। এতে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাংকের, মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। দেখা যায় যে, লুটের কাজে ব্যবহারের জন্য কোনো কোনো দেশ জাল মার্কিন ডলার ছাপে। প্রতিবেদনে বলা হয় : এ লুটের কাজে রাজনৈতিক বৈধতা যোগায় কোনো কোনো উন্নত দেশ। এতে বিশ্বব্যাংকের নাম উল্লেখ করে ১৮৮ নম্বর প্যারাতে যা বলা হয় তার সারকথা দাঁড়ায় এটাই যে, এ লুটের কথা বিশ্বব্যাংক জানে, বিশ্বব্যাংক জানে এ লুট উগান্ডার ও রুয়ান্ডার অর্থনীতিতে কোন ধরনের প্রভাব ফেলে। কিন্তু এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ছিল নীরব।

মজার ব্যাপার হচ্ছে লুটের অর্থের বিপুল অংশ ব্যয় হয় অস্ত্র কেনায় এবং অস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে লুটের কাজ দ্রুততর করা হয়। এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়। লুট থেকে পাওয়া অর্থের শেষ গন্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই গন্তব্য অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আর যুদ্ধ চালানোর অর্থ ও অস্ত্র কোন কোন পন্থায় আসে? প্রতিবেদনে বলা হয় : এটা চলে তিনভাবে। এগুলো হলো : এক. সরাসরি অর্থ দিয়ে কেনা হয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম; দুই. বিনিময়; অর্থাৎ খনিজ সামগ্রীর বিনিময়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়; এবং তিন. যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।

জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা এটাও দেখেন যে, সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর সেনাবাহিনীর জন্য বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ, প্রকৃত খরচ তার চেয়ে বেশি। কিভাবে আসে এ অর্থ? উত্তর সহজ : লুট।

প্রতিবেদনটির আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে কঙ্গোর এ সংঘাতে লুটে জড়িত কয়েক ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা। এ ব্যক্তিবর্গ রাজনৈতিক নেতা নন; কিন্তু ঘটনার নায়ক বা নায়িকা। এদের একটি তালিকা পেশ করে প্রতিবেদনে বলা হয় : এ তালিকা পরিপূর্ণ নয়। লুটে ও সংঘাতে এ নায়ক-নায়িকাবৃন্দ সরাসরি জড়িত। এদের নাম মেজর জেনারেল সলিম সালেহ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেমস কাজিনি, কর্নেল টিকামানিয়ার, কর্নেল উতাফায়ার, জনাব খলিল, জনাব আবদুর রহমান এবং এমন আরো।

প্রতিবেদনে এদের কান্ডকারখানার কম-বেশি উল্লেখ করা হয়। মেজর জেনারেল সালেহ ও তার স্ত্রী কহোয়া উগান্ডা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের মূল চরিত্র। সালেহ উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির ছোট ভাই বা কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তার ডান হাত ব্রি জে কাজিনি। তিনি রক্ষা করেন নিয়মবিসি ও তিবাসিমাকে। আর এ দু’জন রক্ষা করেন তার বাণিজ্য। সে বাণিজ্য হীরা, কাঠ, কফি, সোনার।

এভাবে একের পর এক বিবরণ পড়লে পাঠকের কাছে মনে হতে পারে যে, তা রহস্য উপন্যাসকে যেন ম্লান করে দিচ্ছে।

এ প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে এক নারীর নাম। তিনি যেন নায়িকা। তিনি আজিজা কুলসুম গুলাম আলি। (বাংলায় আমরা হয়তো লিখতাম ‘গোলাম আলি’)। মিসেস গুলাম আলির কয়েকটি পাসপোর্ট। তিনি থাকেন কখনো বুকাভুতে, কখনো ব্রাসেলসে, কখনো বা নাইজেরিয়াতে। ব্যাপারটি নির্ভর করে তার কাজের ওপরে। এ মিসেস ইতিপূর্বে বুরুন্ডিতে গৃহযুদ্ধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বুরুন্ডিতে একদল ‘বিদ্রোহী’কে অস্ত্র ও অর্থ যোগান দিয়েছিলেন। এর পরে, তিনি নতুন জোট গড়ে তোলেন রুয়ান্ডার সরকারের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন কিগালি সরকারের বড় মিত্র। মিসেস গুলাম আলি রুয়ান্ডা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সোনা, কোলটান ও ক্যাসিটেরাইট ব্যবসায়ে জড়ান। এর আগে তিনি জড়িয়ে ছিলেন বুরুন্ডির হটুদের সুবিধার্তে অস্ত্র, সোনা ও গজদন্ড চোরাকারবারে। সিগারেট চোরাচালানেও তার নাম শোনা যায়। বেআইনি ব্যবসাকে তিনি আড়াল করতেন তার সিগারেট ফ্যাক্টরি দিয়ে। সে কারখানা আজ লাটে উঠেছে। কোলটান ব্যবসায়ে তার খদ্দেরদের মধ্য রয়েছে স্টার্ক, কোগেকম, সোগেম। বড় দুটি ব্যাংক তার আর্থিক লেনদেনের কিছুটা সামাল দেয়। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা কয়েকবার অনুরোধ জানালেও বেগম গুলাম আলি তাদের সঙ্গে দেখা দেখা করেননি। এ প্রতিবেদন রচনাকালে কোলটান রফতানি ব্যবসায়ের একচেটিয়া আয়োজনের প্রধান হয়ে ওঠেন তিনি। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জাল নোটও তৈরি করেন। তিনি শুল্ক সংক্রান্ত কাগজপত্র জাল করেন। তিনি বলেছেন, ‘এ ব্যবসায়ে সবাই এটা করে।’ বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন কোলটান রফতানির কোম্পানিগুলোর মধ্যে জুয়াচুরি ব্যাপক।

এসব কর্মে এক শ্রেণীর ব্যাংকও যুক্ত। জাতিসংঘ প্রতিবেদনে এদের নাম ও কাজের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এতে জড়িত এক শ্রেণীর বিশাল কোম্পানি। এগুলো সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। এ লুটের কাজ সহজ করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রশাসনিক কাঠামোও সাজানো হয় উপযুক্তভাবে। কখনো ভিন দেশের প্রশাসনিক প্রধানপদে আসীন করা হয় কঙ্গোর লোককে। তার কাজ হবে স্বদেশে লুটের কাজ সংগঠিত করা।

আর শ্রম? সে তো বিশ্বজনীন। শৃঙ্খলিত শ্রমকে নিয়োগ করা হয় পৃথবীর গভীর থেকে সম্পদ তুলে আনতে। শিশু শ্রমও রেহাই পায় না। লুট কতটুকু, কেমন পরিমাণ হয়? জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনেই উত্তর খোঁজা যাক। প্রতিবেদন বলেছে : ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৯৯৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিদেশী সেনা দলগুলোর দখল করা কঙ্গোর এলাকাগুলো থেকে খনিজ সম্পদ, কৃষিজ ও বনজ সামগ্রী, গবাদিপশু লুটে নিঃশেষ করা হয়েছে; যাকে ইংরেজিতে অভিহিত করা হয়েছে ড্রেইনড অফ। বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, উগান্ডা যে দেশই হোক, লুটের ধরন এক। একজন অফিসারের নেতৃত্বে একদল সৈন্য আসে খামার, গুদামে, কারখানায়, ব্যাংকে, তারা আদেশ দেয় দরোজা খুলে দিতে। সেনারা লুটের মাল তোলে গাড়ির পর গাড়িতে। লুটের মাল নিয়ে গাড়ির বহর চলে যায়। কঙ্গোর একটি অঞ্চলে ১৯৯৮ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালে এপ্রিলের মধ্য ২০০০-৩০০০ টন ক্যাসিটেরাইট ও ১০০০-১৫০০ টন কোলটান লুটে নেওয়া হয়। সৈন্যদের পাহারায় বস্তা বস্তা অর্থ নেওয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে, লুটের অাঁতাত অনেক বিস্তৃত, ব্যক্তি মালিক থেকে রাষ্ট্র, ‘বিদ্রোহী’ থেকে ব্যবসায়ী, সেনানায়ক থেকে অস্ত্র নির্মাতা, সবাই আছে এ কাজে মিলেমিশে। এরাই কি সব? এদের আড়ালে কি কেউ নেই। কোন সে সুতো, যা এদের সবাইকে বেঁধে রাখে এক সঙ্গে? সে কি ধনলিপ্সা, লোভ? সে কি ‘আরো আরো চাই, যত পাই, তত চাই?’ স্থানাভাবে সবের বিবরণে না গিয়ে কেবল কোলটানে কান্ডটাই দেখা যাক। এন্টয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ম্যারিজ ২০০২ সালে রাইজ অ্যান্ড ডিক্লাইন অব দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম বিষয়ে সম্মেলনে পেশ করেন প্লান্ডার, ক্রিমিনালাইজেশন অব দ্য স্টেট অ্যান্ড ডিক্লাইন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম : দ্য কেস অব ডি আর কঙ্গো শিরোনামে প্রবন্ধ। এতে তিনি ছক কেটে দেখান যে, খনি আর নদীর বুক থেকে মজুররা তুলে আনেন কোলটান। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সামরিক চক্রের হাত ঘুরে তা পেঁŠছায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে এবং সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর হাতে। সেগুলো পেঁŠছে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে প্রক্রিয়াকরণ কারখানার ভেতর দিয়ে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো নাম নিয়ে তা হাজির হয় সূক্ষ্ম প্রযুক্তির শিল্পে। এ সামগ্রী প্রক্রিয়ার কারখানা জগতে রয়েছে গোটা বিশেক কাজাখস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রে, জার্মানিতে, চীনে, জাপানে। এগুলোর মধ্যে মাত্র চারটি কারখানা বানাতে পারে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো। সে চারটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, জাপানে, জার্মানিতে, চীনে। আর সূক্ষ্ম প্রযুক্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আলকাটেল কমপ্যাক, ডেল, এরিকসন, এইচপি, আইবিএম, নকিয়া, সিমেন্স, লুসেন্ট, মটোরোলা। বড় চেনা নাম এগুলো। এই চেনা নামের কোম্পানি সব কোটি কোটি খদ্দেরের কাছে পেঁŠছে দেয় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, গেম বা খেলার ডিজিটাল সামগ্রী।

এসবের মাঝে থাকে পরিবহন, ব্যাংক, রাজনীতি, বিধি, শুল্ক, বিশ্ব শক্তি। ডেনা মন্টেগু ২০০২ সালে স্টোলেন গুডস : কোলটান অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ইন দ্য ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন : রোয়ান্ডা ও উগান্ডাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন।

এসবে আরো মিশে থাকে : রক্ত। আরো থাকে : মেহনত, মজুরদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে নেওয়া মেহনত। আর সব শেষে থাকে মুনাফা। কতিপয়ের পকেটে, অ্যাকাউন্টে। সে কতিপয় প্রমোদতরীতে চড়ে ঘুরে বেড়ায় ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপ থেকে দ্বীপে, ক্যারিবিয়ানের সূর্যাস্ত রং মেখে দেয় তাদের চোখে। কোলটানের রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর, ‘সুন্দর’ যাত্রা!

কোলটান থেকে কে কত পায়? এ হিসাব করা প্রায় ধাঁধার উত্তর খোঁজার মতো। কারণ, তথ্যগত বিভ্রান্তি বেশি। একজন গবেষক এ সংক্রান্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে অনুমান করেছেন যে, স্থানীয় বেপারী ১০ ডলার পেলে রুয়ান্ডার ব্যবসায়ী পায় ২০০ ডলার, আর পাঁচ-ছয়জন খনিমজুরের একেকটি গ্রুপ পায় সপ্তাহে ৩০ ডলার। অর্থাৎ দিনে একজন পায় ১ ডলারের কম। আহরণের পরে ৩০ কিলোগ্রাম সামগ্রী বস্তায় ভরে হেঁটে হেঁটে তা নেওয়া হয় স্থানীয় ব্যবসায় কেন্দ্রে, গড়ে ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে। সোনা, হীরা লুটের ঘটনা আরো নিষ্ঠুর। তবে লুটের ধরন একই। সে বিষয়ে আর আলোকপাত না করে আগামীতে দেখা যাবে আরো লোভনীয় ক্ষেত্রে কেমন ঘটনা ঘটে চলেছে।

Friday, October 21, 2011

যুদ্ধে জড়িত কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি

মবুতুর পরে ক্ষমতায় বসানো হলো লরেন্ট কাবিলাকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ অনুগত মিত্র। কাবিলা প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে, ১৯৯৭ সালে একজন প্রতিনিধি পাঠালেন কানাডার টরেন্টোতে। উদ্দেশ্য : বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। কাবিলার বাহিনী গোমা দখলের পর পরই, ১৯৯৭ সালে, আমেরিকান মিন্যারাল ফিল্ডস (এএমএফ) নামের কোম্পানি কাবিলার সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এ এলাকায় দস্তা, তামা ও কোবাল্ট খনিগুলো থেকে খনিজ সম্পদ আহরণের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয় এএমএফকে। এ কোম্পানির প্রধান ছিলেন মাইক ম্যাকমরো। মাইক আবার যুক্তরাষ্ট্রের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বন্ধু। আর এ চুক্তি সম্পাদনে কাবিলার পক্ষে আলোচনা করেছিলেন কঙ্গোর যে লোকটি, তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে আগেই উল্লেখ করা ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে।

ঘটনা, সম্পদ লুটের ঘটনাগুলো খেয়াল করে দেখলে এভাবে বন্ধুত্ব, যোগসাজশ, ইত্যাদি চোখে পড়ে। হানাহানি, হামলা, যুদ্ধ চলতে থাকল। এ সবে সামনাসামনি জড়িয়ে থাকল উগান্ডা, রুয়ান্ডা প্রভৃতি দেশ; আড়ালে রইল বহুজাতিক করপোরেশন (বক), আর বকদের আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র শক্তিগুলো। উগান্ডা ও রুয়ান্ডা চেয়েছে স্ব স্ব দেশের সীমান্ত বরাবর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে। কাবিলা গোটা দেশ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। উপরে উল্লেখিত বইতে বলা হয়েছে, কাবিলার সেনাবাহিনী ও বিরোধী কোঙ্গোলিজ র‌্যালি ফর ডেমোক্র্যাসি নামের বাহিনীকে, দু’পক্ষকেই মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে সংঘাত বেড়েছে, দেশটির অস্থিতিশীলতা বেড়েছে; ফলে বিদেশী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার জন্যই সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়েছে দেশটিকে স্থিতিহীন রাখার।

রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; রুয়ান্ডার সৈন্যদের ও বিদ্রোহী সশস্ত্র দলগুলোকে যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো সেনারা। রুয়ান্ডা কঙ্গোতে সেনাবাহিনী পাঠানোর আগে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট সফর করেছিলেন পেন্টাগন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর। এমনকি, এ সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে রুয়ান্ডা কঙ্গোয় অভিযান শুরু করার আগেই, ১৯৯৮ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই কঙ্গোতে ঢুকে পড়া রুয়ান্ডার সৈন্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দেখা গেছে। আগে উল্লিখিত ‘এ গেম এজ ওল্ড এজ অ্যাম্পায়ার’ বইতে এসব তথ্য রয়েছে।

এদিকে, কঙ্গো-রুয়ান্ডা সীমান্তে রুয়ান্ডার সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে দেয় সামরিক বিষয়ে ঠিকাদার কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে কোম্পানি। এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি হ্যালিবার্টনের সাবসিডিয়ারি। এ ঘাঁটিতে রুয়ান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আবার, উপগ্রহের মাধ্যমে সংগ্রহ করা মানচিত্র ও ছবি কাবিলাকে যোগান দেয় বেকটেল করপোরেশন। এগুলো কাবিলাকে দেওয়া হতো যাতে মবুতুর সৈন্যদের চলাচলের হালনাগাদ খবর ও অবস্থান কাবিলা জানতে পারেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি বেকটেলয়ের পরিচালকমন্ডলীতে বা প্রধান পদে যারা আছেন/ছিলেন, তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন। এদের মধ্যে জর্জ শুলজ, কাসপার ওয়েইনবার্গার প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। আবার, ডিক চেনি এক সময়ে ছিলেন হ্যালিবার্টনের প্রধান। কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুটয়ের মালিক আবার হেলিবার্টন, কেইথ হারমন স্নো ‘দ্য ওয়ার দ্যাট ডিড নট মেক দ্য হেডলাইনস : ওভার ফাইভ মিলিয়ন ডেড ইন কঙ্গো’ প্রবন্ধে লিখেছেন : মানবাধিকার বিষয়ে দলনিরপেক্ষ একজন তদন্তকারী দেখেছেন যে, মিলিটারি প্রফেশনাল রিসোর্সেস ইনকরপোরেটেড এবং কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি দুটির সঙ্গে পেন্টাগনের সম্পর্ক রয়েছে।

এবার লুটের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি। তার ভাই সলিম সালেহ। তিনি তিনটি বিমান ইজারা দিলেন উগান্ডার সামরিক বাহিনীকে। এ বিমানগুলো কঙ্গোতে সৈন্য ও সামগ্রী সরবরাহের কাজে লাগানো হলো। উগান্ডার সেনা কর্তাবৃন্দ, কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলো ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগসাজশে সালেহ নিশ্চিত করলেন যে, ফেরত পথে বিমানগুলো যেন বোঝাই থাকে সোনা, কাঠ, কফি দিয়ে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। রুয়ান্ডায় হীরা খনি নেই। অথচ রুয়ান্ডা ১৯৯৮ সালে ১৬৬ ক্যারেট হীরা রফতানি করে। আর তা ২০০০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৫০০ ক্যারেটে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। পাশ্চাত্যের বিশাল খনি কোম্পানি বারিক গোল্ড করপোরেশন। এটি কানাডীয় কোম্পানি। কঙ্গোর খনি সম্পদে এ কোম্পানির রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। এ কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর পরিচয়? কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরোনে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উপদেষ্টা ভার্নন জর্ডান। এ কোম্পানির উপদেষ্টাদের একজন হচ্ছেন জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ, যাকে সংক্ষেপে জর্জ ডব্লু বুশ বা জর্জ বুশ নামে পৃথিবীর মানুষ চেনেন।

কঙ্গো থেকে সুবিধা পেয়েছে যেসব কোম্পানি, সেগুলোর অন্যতম কানাডার হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। উগান্ডা আর রুয়ান্ডার সামরিক বাহিনী ১৯৯৮ সালে যখন কঙ্গোর মাটিতে পা রাখল, সে সময়েই সেখানে পৌঁছায় হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ব্যাংক পাঁচ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ডলার কর্জ দেয় কঙ্গোয় রুয়ান্ডা সমর্থিত বিদ্রোহী দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। আর, রুয়ান্ডা ও উগান্ডা যখন কঙ্গোয় লুট চালাচ্ছে, সে সময়েই এ দু’দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ছে বলে এ দু’দেশ প্রশংসা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের।

উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলো পরিবেশিত হয়েছে ইতোমধ্যে উল্লেখ করা এ গেম এজ অ্যান্ড… বইতে। সত্য যে কোথায় কোনটি, তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের তথ্য বিপুল। একের পর এক এসব তথ্য সাজালে সহজেই কয়েকটি বই লেখা যায়। এসব তথ্য যথাযথভাবে সংযুক্ত করলে, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক খুঁজে পেলে সত্য আর আড়ালে থাকে না। লুট, হামলা, পেছনে থাকা শক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতির ভালো ভালো কথা, লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার সম্পর্ক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক, ইত্যাদি সত্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। তখন আর বিভ্রান্তি থাকে না এ পৃথিবীর বড় শক্তিদের চেহারা-চরিত্র-বক্তব্য নিয়ে। তবে, এক বিপুল আশ্চর্য তবুও অপেক্ষা করে। সে বিপুল আশ্চর্য হচ্ছে : আজো দেশে দেশে এ শক্তিবর্গের মিত্ররা পরম শ্রদ্ধায় পূজা পান। তারাও ভেবে দেখেন না যে, দেশের সাধারণ মানুষ যেদিন জানতে পারবেন এ পূজনীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এ শক্তিবর্গের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা, সেদিন সাধারণ মানুষই ধিক্কার দেবেন এ ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিবর্গকে। আর, সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তা করেন না, মাঝে মধ্যে করেন। যেমন, আমাদের এ ভূখন্ডেই, আমাদের আজকের বাংলাদেশে, ১৯৪৭ সালের আগে-পরে কতই না শ্রদ্ধা পেতেন মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ। তাকে তো এ দেশেরই মানুষ ধিক্কার দিয়েছেন, প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার কথার প্রতিবাদ করেছেন। কোনো কথাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখতে পারেনি। একইভাবে, দেশে দেশে লুটের সঙ্গে জড়িত যে রাষ্ট্র শক্তি, তার পরম মিত্র, তার আস্থাভাজন লোককে সাধারণ মানুষ কি গ্রহণ করবেন? ধিক্কারে-নিন্দায় উচ্চারিত হবে সে নাম। কারণ, সাধারণ মানুষ কখনোই দেশের সম্মান ও মর্যাদা বলি দেন না। কঙ্গোতেও তাই হয়েছে। বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র শোম্বের নাম আজ আর কেউ উচ্চারণ করেন না শ্রদ্ধায়, সে নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, ধিক্কারে। মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়ে আছেন প্যাট্রিস লুমুমবা।

কঙ্গোর দুর্ভোগের শেষ হয় না। কারণ তার সম্পদ কেবল সোনা, হীরা, কোবাল্টে সীমিত নেই। সেখানে আছে তেল। সে তেলের পরিমাণ একেবারে কম নয়। তাই এ তেল নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং প্রতিযোগিতা প্রবল। ব্রিটেনের পত্রিকা ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায় : কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ৫ নম্বর ব্লক নিয়ে শুরু হয়েছে বিরোধ। এ ব্লকে রয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সেখানে রয়েছে বন, গরিলা, হাতি। এখানে রয়েছে মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো জাতীয় উদ্যান। এ ব্লকটি দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের দুটি তেল কোম্পানিকে। দেশটির আইন অনুসারে জাতীয় উদ্যানে কেবল বৈজ্ঞানিক কাজ চালানো যায়, তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন করা যায় না। দেশটির ৪১ জন এমপি জাতীয় উদ্যানের সীমানা নতুন করে চিহ্নিত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রীর কাছে। প্রতিবেশী উগান্ডায় যুক্তরাজ্যের আরেকটি কোম্পানি, তাল্ল অয়েল সন্ধান পেয়েছে আড়াইশ কোটি ব্যারেল তেলের। এর পর থেকেই তেল তোলার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এ ব্লকে তেল তোলার জন্য পার্টনারশিপ শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি করা হয়। এটা খুব গোপন করে রাখা হয়। এ চুক্তি অনুসারে সিগনেচার বোনাস হিসেবে উৎপাদন দেবে ২০ লাখ ডলার, প্রথম উৎপাদন বোনাস হিসেবে দেবে ২০ লাখ ডলার; আর, একটি বার্ষিক কর দেওয়ার পাশাপাশি এক কোটি ব্যারেল তেল কিনবে ৫০ লাখ ডলারে। মুনাফার ওপরে ভাগাভাগি আছে। এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। সে সংশোধন অনুসারে কিছু অর্থ আবার সিগনেচার বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়। কত পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে অনুমান করা হয়, এ পরিমাণ পাঁচ লাখ ডলার। এ অর্থ দেওয়া হয় চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করার কয়েক সপ্তাহ আগে।

এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তেল কোম্পানিগুলো যে অর্থ দেয়, তার চেয়ে বেশি নিয়ে যায়। তা না হলে এসব কোম্পানি তেল তুলতে আসত না। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দর্শন ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ নয়।

এ লুটের ‘কাহিনী’ বিশাল। তার ধরন অনেক। ব্যক্তি পর্যায়ে, কোম্পানি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে, আইনের ও প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায়, আইন ভেঙে লুট চলে। এ লুট এত ব্যাপক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০০০ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে বলে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন পেশ করেন তাতে এ লুটের একটি দিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

এ প্রতিবেদন ছয়টি উপসংহারে উপনীত হয়। প্রথম উপসংহারেই বলা হয় : গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সংঘাত প্রধানত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রাপ্তি, নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য নিয়ে। এ পাঁচটি খনিজ সম্পদ হলো কোলটান, হীরা, তামা, কোবাল্ট ও সোনা। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ এত যে হতবিহবল হয়ে যেতে হয়। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও আইনহীনতার প্রেক্ষাপটে এ সম্পদ মুঠো না করার প্রলোভন ঠেকানো কঠিন। দ্বিতীয় উপসংহারে বলা হয় : বিদেশী সেনাবাহিনীগুলো সুব্যবস্থিতভাবে কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করছে। তা লুট করা হচ্ছে। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। এসব চক্রের যোগাযোগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তৃতীয় উপসংহারের একটি অংশে বলা হয় : কয়েকটি কোম্পানি কঙ্গোতে যুদ্ধে জড়িত। এসব কোম্পানি যুদ্ধে সরাসরি ইন্ধন যুগিয়েছে। এসব কোম্পানি প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে অস্ত্র যুগিয়েছে। অন্য কয়েকটি কোম্পানি দিয়েছে অর্থ। সে অর্থ খরচ হয়েছে অস্ত্র কেনায়। খনিজ সম্পদের ব্যবসা করে যে কোম্পানিগুলো, তারাই দেশটিতে বেআইনিভাবে খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। লুটের এ কাহিনী আগামীতে আরো তথ্য দেবে।

Thursday, October 6, 2011

লুটের জন্য গণহত্যা (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৪)

এত দুর্ভোগ-দুর্গতি যে কঙ্গোর, সেই কঙ্গো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে ১২০০ সালে। পর্তুগিজ নাবিক দিয়েগো কাও ১৪৮২ সালে আসেন কঙ্গো। তিনিই ছিলেন কঙ্গোয় পদার্পণকারী প্রথম ইউরোপীয়। কঙ্গোর রাজার সঙ্গে পর্তুগালের সম্পর্ক স্থাপিত হয় সে পদার্পণের মধ্য দিয়ে। এর প্রায় সোয়াশ’ বছর পরে শুরু হয় দাস বাণিজ্য, ষোড়শ শতকে ইংরেজ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও ফরাসি বণিকরা আরম্ভ করে মানুষ নিয়ে সে ব্যবসা। তারা সঙ্গে নেয় স্থানীয় সহযোগীদের; দালা, মধ্যস্বত্বভোগীদের। এ বাণিজ্য চলে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত।

বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে উপনিবেশ বানানোর মতলবে গঠন করলেন ব্যক্তিগত ব্যবসা উদ্যোগ; সময় তখন ১৮৭০-এর দশক। দেশটি হয়ে পড়ে রাজা লিওপোল্ডের জমিদারি। শুরু হলো কঙ্গোকে বেলজিয়ামের উপনিবেশকরণ। এর আগেই শুরু হয়েছে আফ্রিকার বিপুল সম্পদ লুট করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইউরোপের সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা। রাবারের চাহিদা বেড়েছে বিপুলভাবে। আর কঙ্গোতে তখন ছিল অনেক রাবার গাছ। তাই বেলজিয়াম রাজের ‘মহতী উদ্যোগ’ কঙ্গোতে। যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবার উৎপাদিত হতো, ততক্ষণ পুরুষ কর্মীদের পরিবারগুলোকে আটকে রাখা হতো। যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবার উৎপাদন করতে পারত না, তাদের দু’হাত কেটে ফেলা হতো। আরো, আরো রাবারের জন্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের যে দাবি, তা প্রতিরোধ করত যারা, তাদেরও ভাগ্যে জুটত দু’হাত কেটে ফেলার ‘পুরস্কার’। এর সঙ্গে ছিল অনাহার, অতি শ্রমে শরীর ভেঙে পড়া, রোগ। এসব আর হত্যা মিলে কঙ্গোতে সে যাত্রা মারা যায় এক কোটি মানুষ। রবার্ট ও’ব্রায়ান এবং মার্ক উইলিয়ামের গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি : ইভোলিউশন অ্যান্ড ডায়নামিক্স বইতে এ তথ্য উল্লেখিত হয়েছে। রবার্ট ও মার্ক আরো লিখেছেন, রাজা লিওপোল্ড যখন কঙ্গো লুট করে চলেছেন, সে সময়ই, বেলজীয় সাম্রাজ্য আর রাবারপতিদের স্বার্থ রক্ষায় সব ‘রাবার চর’ সক্রিয়ভাবে চালাচ্ছে গণহত্যা, নির্যাতন, অত্যাচার।

বার্লিনে ১৮৮৪-৮৫ সালে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সম্মেলনে কঙ্গো অববাহিকায় রাজা লিওপোল্ডের দাবি স্বীকার করে নেওয়া হয়। এ সম্মেলন আহবান করেছিলেন বিসমার্ক। আফ্রিকার মধ্যাঞ্চল নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের মধ্যে যে উত্তেজনা চলছিল, তা দূর করাই ছিল এ ১৫ দেশ সম্মেলনের উদ্দেশ্য। কঙ্গোয় বেলজীয় ও ফরাসি লিপ্সা মেনে নিতে পারছিল না ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ শক্তি। আবার পূর্ব আফ্রিকা ও ক্যামেরুন অঞ্চলে জার্মান সম্প্রসারণও তারা মানতে পারছিল না। তাই উত্তেজনা। এ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বেলজিয়াম রাজ ১৮৮৫ সালে কঙ্গো ফ্রি স্টেট প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করলেন। তিনি হলেন সে ফ্রি স্টেটের প্রধান। কঙ্গোর মানুষ, যাদের রক্তে, শ্রমে এ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি, তারা নিজ দেশে রইলেন পদানত। সাম্রাজ্য-শক্তির কি পরিহাস! সাম্রাজ্য শক্তি এভাবেই সব কালে, সব দেশে স্বনির্মিত ‘সত্য’ জবরদস্ত চাপিয়ে দিয়েছে। তবু সাম্রাজ্যের ক্ষুধা মেটে না। রক্ত ঝরতে থাকে বেলজীয় শক্তিমানরা ১৮৯১-৯২ সালে কাতাঙ্গা দখল করে। এর আগেই, বার্লিন সম্মেলনে কঙ্গো ও নাইজার নদীতে অবাধ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে প্রভাবাধীন এলাকা। এ সবই করা হয়েছে উপনিবেশ বানানোর হুড়োহুড়ি যাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের মধ্যে যুদ্ধ না বাধিয়ে দেয় সে উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ শান্তি বজায় রাখতে হবে লুটের জন্য। লুটেরারা ‘শান্তিপ্রিয়’ কেন হয়, তাদের চাওয়া ‘শাস্তি’ কেমন, চলাচলের অবাধ অধিকার কেন দরকার, এসব স্পষ্ট হয়ে যায় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে। এ ঘটনা আরো দেখিয়ে দেয় : দেশ এক দেশবাসীর, দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে প্রভুরা। এ ঘটনা একটি নয়, সাম্রাজ্যগুলোর ইতিহাসে এমন ঘটনা অনেক। আবার সাম্রাজ্য কেন এমন আচরণ করে, সাম্রাজ্য হয় কিভাবে, কোন শক্তি কাজ করে সাম্রাজ্যের মধ্যে যা সাম্রাজ্যকে নিয়ে যায় অসংখ্য মানুষের রক্ত আর শ্রম আত্মসাৎ করতে, সে বিষয়গুলোও বুঝতে পারা দরকার লুট, হত্যার ইতিহাস বুঝতে পারার জন্য। আজ অবশ্য এ দ্বন্দ্বের কথা অনেকেই অস্বীকার করতে চান হাল্কাচালে বলা চটকদার কথা দিয়ে। ফলে অজানা রয়ে যায় লুটের ইতিহাস। কিন্তু মিলিয়ন মিলিয়ন (দশ লাখে এক মিলিয়ন) মানুষকে ক্রীতদাস বানানোর ঘটনা কি অস্বীকার করা যায়? যায় কি ধন-সম্পদ লিপ্সার।

এ অমানবিক ঘটনা অস্বীকার করা? অন্য আরেক দেশের রাজার জমিদারি হয়ে উঠল এক দেশ! চলতে থাকল মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে দাস বানানো। কেন? গুটিকয় লোকের ভোগের জন্য আরো আরো সম্পদ চাই, সে জন্য। কঙ্গোকে অঙ্গীভূত করে নেয় বেলজিয়াম ১৯০৮ সালে। প্রতিবাদ জানান কঙ্গোর মানুষ। সে প্রতিবাদ দমনে রাজা লিওপোল্ডের চরেরা গণহারে, নির্বিচারে চালায় খুন, হত্যা, নির্যাতন।

ইতিহাসের তথ্য বলে : রাজা লিওপোল্ডের কঙ্গো জমিদারিতে কঙ্গোর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে হয় হত্যা করা হয়েছে, নতুবা তারা অন্যের জন্য সম্পদ তৈরিতে বাধ্য হয়ে কাজ করতে করতে মারা গেছেন, এখানে রয়েছে দ্বন্দ্ব : কতিপয়ের সম্পদ আর অগণিতের মেহনত। অর্থাৎ অগণিত সাধারণ মানুষের মেহনতে তৈরি হয় যে সম্পদ, তা যায় কয়েক লোকের ভোগে। এ দ্বন্দ্ব আজ অস্বীকার করে নতুন পথ খোঁজেন কেউ কেউ। কিন্তু অস্বীকার করলেই তো আর দ্বন্দ্ব মিলিয়ে যায় না। তা চলতেই থাকে। যিনি সে দ্বন্দ্ব অস্বীকার করেন, তিনি কেবল অপেক্ষা করেন বোকা হওয়ার মুহূর্তটির জন্য। কঙ্গোতেও হলো তাই।

স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলো। রক্তাক্ত সে সংগ্রাম। সে লড়াইতে দেশটি ক্ষত-বিক্ষত, কঙ্গো খন্ড খন্ড হওয়ার অবস্থা। উপনিবেশটির ওপর সাম্রাজ্যবাদী প্রভু বেলজিয়াম নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। অবশেষে ১৯৬০ সালে কঙ্গো স্বাধীনতা অর্জন করে। দেশটির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন প্যাট্রিস লুমুমবা। শুরু হয় আরেক রক্তাক্ত অধ্যায়ের। চক্রান্ত আর হত্যাকান্ডে পূর্ণ সে অধ্যায়। সে অধ্যায়তেও নাটের গুরু ধনশালীরা, তাদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো আর এদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।

Thursday, September 29, 2011

কঙ্গো : বিশাল দেশ বিপুল সম্পদ আর মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল (তেল-গ্যাস লুণ্ঠন দেশে দেশে-১৩)

কঙ্গো, আয়তনের দিক থেকে বিশাল এক দেশ, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ গুণ বড়। এ বিশাল দেশের দুর্দশার ইতিহাসও বিশাল। দীর্ঘ সে ইতিহাস যেন দখল, লুট, গৃহযুদ্ধ, দুর্নীতি, আততায়ীর দীর্ঘ ছায়া, অভ্যুত্থান, হানাহানি, আর এ সবের সঙ্গে থাকা মৃত্যুর মিছিল। দীর্ঘ সে মিছিল। সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ বসতচ্যুত। মহামারীও যেন পাল্লা দেয় এসবের সঙ্গে। তাই গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পতাকায় রক্তিম লাল রেখা তার দেশের নাগরিকদের রক্তকেই স্মরণ করে।

যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ আর এদের সঙ্গী অনাহার ও ব্যাধি কেড়ে নিয়েছে অর্ধ কোটি বা ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির ২০১০ সালের হিসাব অনুসারে এ সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এদের প্রায় অর্ধেক হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু। এত মৃত্যুর অধিকাংশই ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল অর্থাৎ মাত্র ৫ বছরের মধ্যে। বিবিসি জানায়, সংঘাতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ফল হিসেবে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। দেশটির এ সংঘাতে যত প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এত মৃত্যু আর কোনো দেশে আর কোনো সংঘাতে ঘটেনি।

অথচ নয় লাখ পাঁচ হাজার বর্গমাইলের বেশি এ দেশে রয়েছে বিপুল সম্পদ : হীরা, ইউরেনিয়াম, সোনা, তামা, কোবাল্ট, দস্তা, কোলটান আর তেল ও গ্যাস। কোলটান ব্যবহৃত হয় মোবাইল ফোনে ও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীতে। কফিও উৎপাদিত ও রফতানি হয়। পশ্চিম ইউরোপের সমআয়তনের এ দেশটির সম্পদ এত বেশি যে, তা-ই এদেশকে করে তুলতে পারে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। এর মাটি উর্বর। এর রয়েছে অনেক পানি। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক খবরে বলা হয় : দেশটির হীরা শিল্প বছরে ৮৭ কোটি ডলার আয় করে। সে শিল্প প্রায় ১০ লাখ খননকারীকে কাজ দিয়েছে। কিন্তু বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করে তারা জনপ্রতি দিনে আয় করে এক ডলারেরও কম। কি নির্মম লোভ খনি মালিকদের!

এই হীরা, ইউরেনিয়াম, সোনা, তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদই যেন দেশটি জুড়ে আয়োজন করেছে মুনাফাবাজদের ‘খেলা’। সে ‘খেলা’র নাম আজ আফ্রিকাজ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়্যার, আফ্রিকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আফ্রিকার ইতিহাসে বৃহত্তম যুদ্ধ ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে কঙ্গো, খুব সম্পদ সমৃদ্ধ দেশ। এ বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ভান্ডার দেশটিতে যুগে যুগে ডেকে এনেছে অভিযাত্রী, দখলদার, সাম্রাজ্য বিস্তারকারী রাজশক্তি, আধুনিক বেপারী, বহুজাতিক করপোরেশনকে। এদের চেহারা ছিল সুন্দর-সভ্য। এদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় দালালরা, মুৎসুদ্দিরা, যুদ্ধবাজরা। আর ছিল দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সরকার। এরা সবাই মিলে দেশের জনসাধারণকে বিভক্ত করল, জাতিগত, গোত্রগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করল, এ  প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পৌঁছে দিল বিদ্বেষ আর সংঘাতের পর্যায়ে। দশকের পর দশক ধরে চলা লুট, দুর্নীতি, হানাহানি, ষড়যন্ত্র দেশটির অর্থনীতিকে করে ফেলল স্থবির, পঙ্গু।

কঙ্গো ও তার আশপাশের নয়টি দেশ বসে আছে এ পৃথিবীর সব চেয়ে ধনসমৃদ্ধ অংশে। অথচ ধন লোভী সাম্রাজ্যবিস্তার, মুনাফা সন্ধানী কোম্পানির ষড়যন্ত্রের পরে ষড়যন্ত্রে, সংঘাতে দেশটির আবাদ ধ্বংস হলো, কার্যত থেমে গেল বাণিজ্য, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থা, শিক্ষ যোগান দেওয়া গেল না; এগুলো নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গড়ে উঠল না অবকাঠামো। দেশটি হয়ে উঠল প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র দল-উপদলের রণক্ষেত্রে। কখনো সরকারি বাহিনী আর বিদ্রোহীদের মধ্যে চলল লড়াই। একদিকে সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে এঙ্গোলা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে আরেকদিকে বিদ্রোহীদের মদদ দিয়েছে রুয়ান্ডা ও উগান্ডা। সব বিবাদের আড়ালে ছিল কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নিতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর খেলা।

জাতিসংঘের একটি প্যানেল ২০০১ সালে উল্লেখ করে : সোনা, হীরা, গাছের কাঠ, কোলটান, লুট করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধরত পক্ষগুলো ইচ্ছে করে সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে। এর আট বছর পরে ২০০৯ সালে জাতিসংঘ নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিবেদনে বলা হয় : বিদ্রোহীরা মানুষ হত্যা করছে, লুট করছে প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ এরা রয়ে যাচ্ছে আইনের, বিচারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ বিদ্রোহীদের মদদ যোগাচ্ছে দুর্বৃত্তদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বা জাল। এ জাল ছড়িয়ে আছে গোটা আফ্রিকাজুড়ে, সেখান থেকে পশ্চিম ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকায়। পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে : সে জাল বোনে কারা?

জাতিসংঘের ২০১০ সালের হিসাব অনুসারে দেশটির জনসংখ্যা ছয় কোটি ৭০ লাখ। সে দেশের পুরুষের গড় আয়ু ৪৭ বছর, আর নারীদের ৫০। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুসারে, দেশটির রফতানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে হীরা থেকে; এর পরই অশোধিত তেল, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বাকিটুকু আসে কোবাল্ট, তামা, কফি ও অন্য পণ্য থেকে। দেশটির প্রবৃদ্ধি ২০০০ সালেও ছিল বিয়োগাত্মক। মাইনাস সাত শতাংশ। তা ২০০১ সালে কমে আসে মাইনাস দুইয়ে। এর পরে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২০০২ সালে তা দাঁড়ায় ৪ শতাংশ; তা ২০০৩ ও ২০০৪ সালে আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৬ শতাংশে। দেশটির সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার বেলজিয়াম, দেশটির সাবেক সাম্রাজ্যবাদী প্রভু দেশ। এর পরের স্থান যুক্তরাষ্ট্রের। তারপর চীনের। এসব তথ্যের আড়ালে রয়ে গেছে নিষ্ঠুর সব সত্য।

বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব থেকে দেখা যায় : গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ১৯৯০ সালে গড় আয়ু যা ছিল, সেটা ২০০৪ সালে হ্রাস পায়, শিশু মৃত্যুর হার থাকে একই, অথচ একই সময়ের ব্যবধানে চীন ও যুক্তরাজ্যে গড় আয়ু বেড়েছে এবং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রবৃদ্ধি হার ২০০২ সাল থেকে বাড়তে থাকে। অর্থাৎ কেবল প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে দেশটির নাগরিকদের অবস্থা বুঝতে পারা যাবে না। যখন প্রবৃদ্ধি হার বেড়ে চলেছে সে সময়ের আগে থেকে, ১৯৯৩ সাল থেকে, রুয়ান্ডার সেনাবাহিনী ও এ সেনাবাহিনী সমর্থিত বিদ্রোহীরা কঙ্গোতে যে অপরাধ সংঘটিত করেছে, তাকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ অবস্থা চলতে থাকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। তা হলে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, এমন অবস্থায় প্রবৃদ্ধি বাড়ল কিভাবে? সহজে এর উত্তর দেওয়া যায়। তা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ রফতানি বা পাচার হয়েছে বিপুল। সে সম্পদের দাম হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ দেশবাসী পেয়েছেন কিনা, সে প্রশ্ন অবশ্য রয়েছে।

এ দেশটিতেই জাতিসংঘ পাঠিয়েছিল শান্তিরক্ষা বাহিনী, জাতিসংঘের ইতিহাসে বৃহত্তম শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। কমপক্ষে ১০ বছর ধরে চলেছে সে কার্যক্রম। এক সময় কিছুদিন আগেও সে দেশে পুলিশ খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ পুলিশ ছিল। তারা থাকত গরহাজির বা মাতাল অবস্থায়। পাহাড়ে পাহাড়ে ছিল সশস্ত্র দল-উপদল। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়; তার আগে প্রণীত হয় সংবিধান। নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এসব নির্বাচন দেশটিতে বিনিয়োগের এবং সংঘটিতভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পরিবেশ তৈরি করবে। এ আশা বিনিয়োগকারীদের, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণকারীদের। এ ঘটনা ধারা আর আশার মধ্যে যে সম্পর্ক, তা অনেকের কাছে নির্মম পরিহাস বলে মনে হতে পারে। লুট আগেও হতো। প্রাকৃতিক সম্পদ আগেও অর্থকড়ি যোগাত কতিপয় লোককে; কিন্তু হানাহানি, রক্তারক্তির পরিবেশে বিনিয়োগ যেমন স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ হয় না, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের কাজে তেমনি ঝুঁকি ও খরচ থাকে বেশি। তাই বিনিয়োগ ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ সহজ-স্বচ্ছন্দ হয় শান্তির পরিবেশে। তাই খুব দরকার ছিল সংবিধান সম্মত শাসনের, নির্বাচনের। তাই বলে এ কথা মনে করার কারণ নেই যে, সংবিধান ও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার জনগণের দরকার নেই। বরং এ পরিবেশ জনগণকেও সুযোগ করে দেয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে তোলার, এগিয়ে নেওয়ার।

তবে বিনিয়োগকারী, প্রাকৃতিক সম্পদ লুট বা আইনসম্মতভাবে আহরণ করে অর্থশালীরা যে লাভবান হন, তার জন্য দাম দিতে হয় জনসাধারণকে। সে দাম চড়া, খুব চড়া। সব দেশের মতো কঙ্গোর ইতিহাসও তাই বলে। কেবল একটি বিষয়ই তা প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট। সে বিষয়টি হচ্ছে ধর্ষণ। কঙ্গোতে এত হানাহানি, যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা যেন মহামারির রূপ নেয়। এগুলো চালিয়েছে সশস্ত্র দল-উপদল, সেনাবাহিনীর লোকেরা। কোনো কোনো সশস্ত্র দল এ জন্য নারীদের ক্রীতদাসীর মতো করে রাখত।

এক সমীক্ষার বরাত দিয়ে এ বছরই ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয় : কঙ্গোয় ‘প্রায় প্রতি মিনিটে’ একজন করে নারীকে ধর্ষণ করা হতো। সেখানে একজন নারীর ধর্ষিতা হওয়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ১৩৪ গুণ বেশি। এসব হিসাব এ সংক্রান্ত আগের হিসাবগুলোর চেয়ে ২৬ গুণ বেশি।

আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথে প্রকাশিত সমীক্ষা প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, ১২ মাসে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী চার লাখের বশি নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় : প্রতিদিন এক হাজার ১শ’ জনের বেশি বা প্রতি পাঁচ মিনিটে চারজন। এ সীমাক্ষার আগে আরো কয়েকটি সমীক্ষা চালানো হয়। সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল জাতিসংঘ পরিচালিত সমীক্ষা। সে সব সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০০৬-০৭ সালে ১২ মাসে ১৫ হাজার নারীকে ধর্ষণ করা হয়।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রতিবেদনটি রচনা করেন এমবার পিটারম্যান। তিনি সরকারি নথিতে থাকা তথ্য এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রতিচ্ছবি থাকে, এমন তথ্যই কেবল ব্যবহার করেছেন। তাই তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক হিসাবও কম, খুব কম। এ হিসাব গুণতে পারেনি তাদের, যারা লজ্জার কারণে তথ্য জানাননি; এ হিসাবের গণ্য হয়নি সে সব ঘটনা, যেগুলো ক্ষমতার কারণে ফাঁস হয়নি; এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হননি বৃদ্ধারা বা একেবারে কম বয়সীরা। নির্মমতা, বর্বরতা, অমানবিকতার চরিত্র ফুটে ওঠে কেবল এ তথ্যটুকুর মধ্য দিয়েই। কোনো আদর্শ, কোনো রাজনীতি, কোনো শত্রুতার সূত্র, কোনো বৈরীতা এ কাজকে সমর্থন করতে পারবে না। কারণ, তা সমর্থন করলে সে আদর্শ, সে রাজনীতি- সে বৈরীতা হারাবে তার অবস্থান। অথচ লুট, সম্পদের লোভ কত নিষ্ঠুর, কত অমানবিক হতে পারে যে, তার অনুসৃত কর্মধারা তৈরি করে এমনই অমানবিকতা, মানবতার অপমান!